জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবারও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং প্রচণ্ড গরমে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সন্দেহভাজন গ্যাস বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত হওয়া কুমামোতোর এইওন (Aeon) শপিংমলের ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, শপিংমল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে বের করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, একজনের কোনো জীবনচিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং বাকি পাঁচজন গুরুতর ও সামান্য আহত অবস্থায় রয়েছেন।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পে বহু বাড়িঘর ধসে পড়েছে, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া কয়েক হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন। চলতি সপ্তাহান্তে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উকি শহরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে শত শত বয়স্ক মানুষ পাতলা মাদুরে মেঝেতে রাত কাটাচ্ছেন। সেখানে আশ্রয় নেওয়া এক নারী বলেন, "এই আশ্রয়কেন্দ্র না থাকলে কী হতো জানি না। বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, গাড়িতেও থাকা যাচ্ছে না—অসহ্য গরম আর মশার উপদ্রব।"
চার সন্তানের বাবা ও সুপারমার্কেট কর্মী হিরোইউকি মাতসুশিমা বলেন, "এই গরমে বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া টিকে থাকা খুবই কঠিন।"
অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন অনেকে
ভূমিকম্পের পর শপিংমলটি খালি করা হলেও প্রায় ৫০ মিনিট পর সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লিক থেকেই এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। বিস্ফোরণের সময় কতজন কর্মী ভেতরে ছিলেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
ব্যবসায়ী ফুমিহিকো মাতসুউরা জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি ওই শপিংমলে গিয়ে 'টয় স্টোরি' সিনেমা দেখেছিলেন। তিনি বলেন, "আমি তো সেদিনই এখানে ছিলাম। মনে হচ্ছে অল্পের জন্য বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেছি।"
কারখানায়ও প্রাণহানি
ইয়াতসুশিরো শহরের নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানায় একটি লাল-সাদা চিমনি ধসে পড়ায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আরও চারজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ ও পানির সংকট
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার ৬৭০টি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৮৪ হাজার বাড়িতে পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। টেলিভিশনের ফুটেজে জ্বালানি ও বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে মানুষকে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শত শত এয়ার কন্ডিশনার পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভূমিকম্পপ্রবণ জাপান
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ভূমিকম্পের মাত্রা ৭.১ জানালেও, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এর মাত্রা ৬.৮ বলে উল্লেখ করেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের 'রিং অব ফায়ার' অঞ্চলে চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। ২০১৬ সালে কুমামোতোতে শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে ২৭৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৮০০ জনের বেশি আহত হয়েছিলেন।
এছাড়া ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন। ওই দুর্যোগেই ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইতিহাসের অন্যতম বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে।
0 মন্তব্য