ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদল হোক কিংবা বর্তমান নেতৃত্বই ক্ষমতায় থাকুক—লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে না যাওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির প্রধান নাঈম কাসেম বলেছেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে কে আসছে, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ নেই; বরং লেবাননের দখল করা ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়াই ইসরাইলের জন্য প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে তিনি স্পষ্ট করেছেন, দখলদারত্ব ও আগ্রাসন চলতে থাকলে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনারও সুযোগ নেই। এতে ইসরায়েল-লেবানন চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) এক লিখিত বিবৃতিতে এসব কথা বলেন হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম।
আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিনি সংগঠনটির অবস্থান স্পষ্ট করেন। কাসেম বলেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে কে থাকছেন, তা নিয়ে হিজবুল্লাহর মাথাব্যথা নেই। তবে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারত্ব চলতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলকে কে শাসন করছে, তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। তবে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইসরায়েল তার দখলদারত্ব চালিয়ে যেতে পারে না। তাকে আমাদের ভূমি ছেড়ে যেতে হবে।’
বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ প্রধান জানান, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। তাঁর দাবি, লেবানন ও সংগঠনটির বিরুদ্ধে আগ্রাসন চলতে থাকলে তার মোকাবিলা করা হবে।
কাসেম বলেন, ‘প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। আমাদের এবং লেবাননের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসনের মোকাবিলা করা হবে। যত দিন দখলদারত্ব ও আগ্রাসন চলবে, তত দিন হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।’
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে লেবানন সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সংগঠনটির বিরোধ এখনো কাটেনি।
আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরও কোনো রাজনৈতিক জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রাথমিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট এগিয়ে থাকলেও তাঁর ক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই হিজবুল্লাহ প্রধানের বক্তব্য সামনে এসেছে। তবে ইসরাইলের নির্বাচনী ফল যেদিকেই যাক, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং চলমান সংঘাতের অবসানকেই নিজেদের অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে সংগঠনটি।
একসময় লেবাননের রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী হিজবুল্লাহ ২০২৩ সালের পর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে।
দুই পক্ষের সংঘাত লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির কারণ হয়। পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা কমানো এবং সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গত জুনে লেবানন ও ইসরায়েলের কর্তৃপক্ষ একটি কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, দখল করা ভূখণ্ড থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে চুক্তির পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল দখল করা ভূখণ্ড ও এর আশপাশে মাঝেমধ্যে বিমান হামলা এবং স্থাপনা ধ্বংসের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ সংগঠনটিকে নিরস্ত্র করার সরকারি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের যুক্তি, ইসরাইলি দখলদারত্ব ও হামলার পরিস্থিতিতে অস্ত্র ত্যাগের প্রশ্ন ওঠে না।
হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান এখনো বড়। একদিকে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি ও হামলার অভিযোগ, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের দাবি—এই বিরোধ সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কাঠামোগত চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা অগ্রসর হতে পারে এবং সীমান্তে নতুন সংঘাত এড়াতে কার্যকর সমঝোতা সম্ভব হয় কি না।
আপাতত হিজবুল্লাহর অবস্থান স্পষ্ট—ইসরায়েলি দখলদারত্ব ও আগ্রাসন বন্ধ না হলে অস্ত্র ত্যাগের প্রশ্নে তারা ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে এই অবস্থান লেবাননের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও চুক্তির বাস্তবায়নে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
0 মন্তব্য