দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। সংকটের কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজতে দিন-রাত কাজ করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক ও পর্যালোচনা চলছে। কীভাবে দ্রুত দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জ্বালানি বিভাগ। পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মনিটরিং করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে প্রধানত চারটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলো—দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতি, জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ খাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে যাওয়া।
তবে সামগ্রিক সংকটের জন্য সবচেয়ে বড় দায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তাদের অভিযোগ, সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। লোডশেডিং কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হলেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতকে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়।
এ ছাড়া পছন্দের ব্যক্তিদের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে কেন্দ্র করে ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই সময়ের সিদ্ধান্তের ভয়াবহ প্রভাব এখন প্রকাশ পাচ্ছে এবং এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চলমান সংকট মোকাবিলায় বর্তমান বিএনপি সরকারকেও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি কূপ খনন এবং তিনটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, ওই সময়ের মধ্যে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করা। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ আগামী চার বছরে গ্যাস সরবরাহ প্রায় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
একই সঙ্গে কয়লার উৎপাদন বাড়াতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা হবে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনগণ যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ সচেতন। তবে এ সংকট বর্তমান সরকারের তৈরি নয়; এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুলনীতি ও অনিয়মের ফল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যাটি হঠাৎ তৈরি হয়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিছু বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে সরকার।
সাধারণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগে উৎসাহিত হয়ে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব আসতে পারে।
এ ছাড়া আগামী তিন বছরের মধ্যে পায়রা, বড়পুকুরিয়া ও মাতারবাড়ীতে অন্তত তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লোডশেডিং মোকাবিলা
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও দায়ী। বিশেষ করে ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বেসরকারি খাতে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত আউটপুট পাওয়া না গেলেও সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার স্থানীয় উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি আমদানিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে একটি টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আরও অন্তত দুটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সমুদ্রের ব্লক বরাদ্দে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ওই দরপত্রের শেষ সময় আগামী নভেম্বর।
এ ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে শিগগিরই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রাথমিক জ্বালানি—তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানো। কারণ এসব জ্বালানি ছাড়া দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কলকারখানা, রান্না ও পরিবহণসহ কোনো খাতই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই খাতই বড় সংকটে রয়েছে।
গ্যাসের বিষয়ে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
একইভাবে দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, কয়লার চাহিদা পূরণও দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা প্রয়োজন হয়, যার শতভাগই ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
১০ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সপ্তাহে সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানান। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকেরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বলা হয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। কয়লা ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধের কারণে এখন জ্বালানি সরবরাহ ও ক্রয়মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমুদ্র ও স্থলভাগে কোনো কূপ খনন করা হয়নি বলেও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পরও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে কূপ খননের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এমনকি কোরিয়ার ডাইয়ু কোম্পানি সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর কূপ খননের জন্য সরকারের কাছে কিছু শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেই শর্ত মেনে নেয়নি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ প্যাকেজ
বিদ্যুৎ খাতে আপাতত ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সবার আগে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে চায় সরকার।
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য এরই মধ্যে কৌশলপত্র ঘোষণা করা হয়েছে।
মার্চেন্ট পাওয়ারের আওতায় বিশেষ প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যে কেউ ব্যাটারিসহ সোলার প্যানেল স্থাপন করে সরকারের বিতরণ কোম্পানির কাছে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। এই প্যাকেজের আওতায় ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুবিধার আওতায় আবেদন করা যাবে এবং প্যাকেজটির মেয়াদ থাকবে তিন বছর।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি প্রস্তুত রয়েছে। এখন কোন পদ্ধতিতে এসব কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে চলতি লোডশেডিং পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
পিডিবি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিদ্যুৎ খাতে আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৌরবিদ্যুতের ৩৭টি প্রকল্পের সম্মতিপত্র বা লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করা হয়েছে। বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এতে বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ
গত সাত মাস ধরে গ্যাস ও জ্বালানি তেল নিয়ে সরকারকে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে এ পর্যন্ত সরকারের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও এক দফা বেড়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৭ ডলারে পৌঁছায়। ফলে তেল আমদানিতে সরকারের লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বেশি দামে এলএনজি কিনে কম দামে বিক্রি করায় এ পর্যন্ত সরকার এ খাতে ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
২০৩০ সালে দৈনিক ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য
দেশকে এগিয়ে নিতে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হবে।
আগামী ১০ বছরে আরও চার থেকে পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন করে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান সরকারের মেয়াদে দেশে দৈনিক ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুতের লক্ষ্য
জ্বালানি তেলের মজুত ৯০ দিনে উন্নীত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে তেলের মজুত রয়েছে ৩২ দিনের। এর আগে এই মজুত ছিল মাত্র ১৭ দিনের।
এ ছাড়া ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ স্থাপনের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ইতোমধ্যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে।
এর বাইরে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে প্রতি মাসে এলপিজি দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) প্রতি মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিপিসি ইতোমধ্যে মহেশখালী, কাট্টলী, মাতারবাড়ী, মোংলা ও অ্যালেঙ্গায় এলপিজি ডিপো স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
গ্যাস সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
গরম বাড়ার কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি।
পিডিবি অভিযোগ করেছে, ২০২২ সালে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক যেখানে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, সেখানে বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮৭ কোটি ঘনফুট।
পিডিবির মতে, লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হলো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিপুলসংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও এসব কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।
পিডিবি আরও জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ খাতকে ভর্তুকিনির্ভর করে ফেলেছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে সরকার এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে ৩২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
সব মিলিয়ে গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানো, স্থানীয় উৎসে অনুসন্ধান জোরদার, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে চলমান সংকট কাটিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
0 মন্তব্য