মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, বৈধ বাণিজ্যের স্থবিরতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটকে পুঁজি করে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, সার, ডিজেল, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও সার জব্দ করলেও সংঘবদ্ধ চক্র চোরাচালান করছে। মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট ও ডিজেলসহ বিভিন্ন পণ্যের চড়া মূল্য চোরাচালানিদের বেপরোয়া করে তুলেছে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, চক্রটি বাংলাদেশ থেকে পাঠানো সামগ্রীর বিনিময় হিসেবে অনেক সময় ইয়াবা নিয়ে আসছে।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন সমুদ্রপথ এবং নাফ নদী চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তের ওপারে রাখাইনের মংডু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বৈধ আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী ও কৃষি উপকরণের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের তুলনায় সেখানে এসব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় পাচারকারীরা বিপুল মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে। মিয়ানমারে গত সপ্তাহে এক বস্তা সিমেন্ট ৩২ হাজার থেকে ৪২ হাজার কিয়াত পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। ১ ডলারে ২ হাজার ১শ কিয়াত। ফলে মিয়ানমারে এক বস্তা সিমেন্ট কিনতে প্রায় ২০ ডলারের মতো ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৫ ডলারের বিনিময়ে এক বস্তা সিমেন্ট পাওয়া যায়।
অপরদিকে মিয়ানমারে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার ১ লাখ ৫৭ হাজার কিয়াত এবং এক বস্তা ডিএপি সার ১ লাখ ১৫ হাজার কিয়াত। মূল্যের এই বড় ব্যবধানের কারণে চট্টগ্রামের সিইউএফএল, কাফকো এবং ডিএপি সার কারখানায় উৎপাদিত সারের একটি অংশ মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি কোস্টগার্ডের এক অভিযানে তিনটি কার্গো নৌকা থেকে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট, ২৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করে ২২ জনকে আটক করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য মিয়ানমারের মংডু এলাকায় পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। তদন্তে আরো উঠে আসে, সারের বস্তায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) লোগো ব্যবহার করে পণ্যের পরিচয় গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এর আগেও বঙ্গোপসাগর হয়ে রাখাইনে সার পাচারের সময় ১১ জনকে আটক করে কোস্ট গার্ড। একইভাবে নৌবাহিনী কুতুবদিয়া উপকূলে অভিযান চালিয়ে ৬৫০ বস্তা সিমেন্ট, এক হাজার লিটার ডিজেল এবং একটি নৌযান জব্দ করে। আটক ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে অধিক লাভের আশায় এসব পণ্য মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছিল নৌবাহিনী।
দেখা যায়, বাংলাদেশে সরকার ভর্তুকির কারণে কৃষকরা তুলনামূলক কম দামে সার কিনতে পারেন। অন্যদিকে মিয়ানমারে যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙনের কারণে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। একইভাবে সিমেন্টের দামও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই মূল্যবৈষম্যই পাচারকারীদের প্রধান প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে।
সূত্র বলেছে, রাখাইন সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ–সংলগ্ন মিয়ানমার সীমান্তের অধিকাংশ অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বৈধ বাণিজ্য সংকুচিত হলেও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও চোরাচালানের ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের পাশাপাশি পণ্য পাচারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চোরাচালানকারীরা সাধারণত গভীর রাতে ছোট কার্গো নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে। উপকূলের নির্জন ঘাট থেকে পণ্য তুলে নাফ নদী বা সমুদ্রপথে রাখাইনের উপকূলে পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ জেলেদের নৌযানও এ কাজে ব্যবহার করা হয়।
নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও চোরা পথে বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়মিত পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্রটি নৌ বাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজকে পাহারা দিয়ে পণ্য পাচার করে। আবার অনেক সময় মাছ ধরার ভাব নিয়ে নৌবাহিনীর টহল এড়িয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছে যায়। নৌকা বা ট্রলারে বিশেষ কৌশলে পণ্য লুকিয়ে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, মিয়ানমারে সার, ডিজেল, সিমেন্ট বা ওষুধ পাচারের ফলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার ভর্তুকির পণ্যই মূলত সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে। এটি সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
টেকনাফ–সেন্টমার্টিন উপকূলে সমন্বিত নৌ টহল জোরদার, সার ও সিমেন্টের পাইকারি সরবরাহ চেইন নজরদারির আওতায় আনা, সীমান্তঘাটে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং পাচারকারীদের অর্থায়নকারী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উপর গুরুত্বারোপ করে সূত্র বলেছে, মিয়ানমারের সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ ও নির্মাণসামগ্রী পাচারের প্রবণতা ততই বৃদ্ধি পাবে।
0 মন্তব্য