‘বাবা, আমি বাসায় যাব’—আইসিইউতে বাবাকে দেখে এটাই ছিল ৭ বছরের অনুশ্রী দাশের আকুতি। কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না তার।
চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী অনুশ্রী দাশ আর কোনো দিন স্কুলে যাবে না। এক সপ্তাহ আগে জ্বর, এরপর ডেঙ্গু শনাক্ত, হাসপাতালে ভর্তি এবং শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু—মাত্র সাত বছর বয়সেই থেমে গেল ছোট্ট অনুশ্রীর জীবন।
গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় অনুশ্রী। মেয়েকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় বাবা সুবল চন্দ্র দাশ ও মা লিপি রানী দাশ। যে ঘরটি মাত্র কয়েক দিন আগেও মেয়ের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর ছিল, সেই ঘরেই এখন ফিরেছে নিথর অনুশ্রীর দেহ।
অনুশ্রীর বাবা সুবল চন্দ্র দাশ একজন দন্ত চিকিৎসকের সহকারী। মেয়েকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাকে হারাতে হয়েছে।
সুবল চন্দ্র দাশ জানান, গত ১২ সেপ্টেম্বর অনুশ্রীর জ্বর আসে। ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা দেওয়া হয়। পরদিন ১৫ সেপ্টেম্বর পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। ওই সময় তার রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার।
চিকিৎসকের পরামর্শে অনুশ্রীকে বাসায় নিয়ে তরল খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সে কিছুই খেতে পারছিল না। পরে তাকে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার প্লাটিলেট দ্রুত কমে ২৩ হাজার ৫০০-তে নেমে আসে।
অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা জানান, অনুশ্রীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউ (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) প্রয়োজন। এরপর আইসিইউ শয্যার জন্য নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেন স্বজনেরা। পরে অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হাসপাতালের আইসিইউতে অনুশ্রীকে ভর্তি করা হয় শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে।
সুবল বলেন, আইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মেয়ের অবস্থা ভালো নয় বলে জানান। একপর্যায়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান তিনি। তখন অনুশ্রী বারবার তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিল। হাসপাতালে থাকতে ভালো লাগছে না জানিয়ে মায়ের জন্যও কান্না করছিল সে।
শুক্রবার বিকেলে চিকিৎসকেরা সুবলকে জানান, অনুশ্রীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হতে পারে। মেয়েকে দেখার পর অনুশ্রী বাবাকে বারবার বলছিল, ‘বাবা, আমি পানি খাবো।’
মেয়ের এই আকুতি শুনে চিকিৎসকদের কাছে পানি দেওয়ার অনুরোধ করেন সুবল। তবে চিকিৎসকেরা জানান, পানি দেওয়ার পর অনুশ্রী বমি করেছে। তাই ওই অবস্থায় মুখে পানি দেওয়া সম্ভব নয়।
এরপর ধীরে ধীরে আরও নিস্তেজ হয়ে পড়ে ছোট্ট অনুশ্রী। শেষ পর্যন্ত শনিবার বিকেল ৪টার দিকে সে মারা যায়।
অনুশ্রী ছিল সুবল চন্দ্র দাশ ও লিপি রানী দাশ দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। তাদের এক ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য অনুশ্রীর মৃত্যুতে এখন পুরো পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বেড়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ১১০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। একই সময়ে চলতি বছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
0 মন্তব্য