ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নে ছয় শত বছরের বেশি পুরোনো শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) উজ্জয়নের শাহী মসজিদের কাছে এ ঘটনা ঘটে। ২০২৮ সালের সিমহাস্থ ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদের একটি অংশ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিপুলসংখ্যক মুসলিম সেখানে জড়ো হন।
কী নিয়ে বিরোধ
মুসলিম প্রতিনিধিদের দাবি, শাহী মসজিদটি ১৩৯০ সালে নির্মিত এবং এটি ওয়াকফ সম্পত্তি। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে মসজিদের নামাজের কক্ষের একটি অংশ, ১২০ ফুট উঁচু একটি মিনার এবং মাজহার চৌক এলাকার কিছু অংশ অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উজ্জয়িন মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন জানিয়েছে, কান্থাল চৌরাস্তা থেকে গোপাল মন্দির পর্যন্ত সড়কটি ১৫ মিটার প্রশস্ত করার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। ২০২৮ সালের সিমহাস্থ উৎসবের আগে শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে মুসলিম বাসিন্দা ও মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিরা বলছেন, মসজিদটি অক্ষত রেখে সড়কের বিপরীত পাশ থেকে প্রশস্ত করার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
কী ঘটেছিল সোমবার
স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাতভর আলোচনার পর মসজিদ কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নিজেরাই অপসারণে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছিল। পরে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের একাংশ নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও ‘মৃদু শক্তি’ প্রয়োগ করা হয়। সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ছবিতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে দেখা গেছে। পরে মসজিদ ঘিরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে ওই এলাকায় মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ও ড্রোনের ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদালতে গড়িয়েছে বিরোধ
মসজিদের অংশ অপসারণের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে আইনি লড়াই চলছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ মসজিদের নির্দিষ্ট অংশ অপসারণের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে করা আবেদন খারিজ করেন।
আদালত বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। মসজিদটি মুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনা হওয়ায় একে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—এমন দাবিও আদালত গ্রহণ করেননি।
রায়ে আরও বলা হয়, একই সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় ১০টি মন্দির এবং আরেকটি মসজিদের কিছু অংশও অপসারণ করা হয়েছে।
তবে শাহী মসজিদ কমিটি বৃহত্তর বেঞ্চে বিষয়টি নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রেখেছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের বক্তব্য
মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিরা বলছেন, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের আগে বিকল্প প্রকৌশলগত সমাধান বিবেচনা করা উচিত।
সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাকির বলেন, ‘আমরা মসজিদটি রক্ষা করতে চাই।’ তিনি জানান, মসজিদ অপসারণ ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা রাতভর সেখানে অবস্থান করেছিলেন।
ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিমও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আগের সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আশপাশের দোকান ও অন্যান্য সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যসভার এমপি ইমরান প্রতাপগড়িও মসজিদের অংশ অপসারণের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ৬০০ বছরের বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা অপসারণের পরিবর্তে সড়কের বিপরীত পাশ থেকে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান; প্রকল্পটির আইনগত বৈধতা নিয়ে স্বাধীন কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
সামনে কী
২০২৮ সালের সিমহাস্থ উৎসবকে সামনে রেখে উজ্জয়নে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক প্রশস্তকরণ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে শাহী মসজিদের অংশ অপসারণ নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের আপত্তি এবং আদালতে চলমান আইনি প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। মসজিদ কমিটির আইনি চ্যালেঞ্জ এবং সড়ক প্রকল্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন নজর রয়েছে।
0 মন্তব্য