ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মরদেহ সোমবার সন্ধ্যায় পবিত্র শহর কোমে পৌঁছেছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে রাজধানী তেহরানের রাজপথে তাঁর শেষযাত্রায় লাখো মানুষের ঢল নামে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমর্থক সাধারণ মানুষ ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা শোকযাত্রায় অংশ নেন। খামেনি ও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মরদেহবাহী ট্রাকটি ধীরগতিতে রাজধানীর পশ্চিমাংশের আজাদি স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যায়।
সোমবার তেহরানে অনুষ্ঠিত শোভাযাত্রার পর মঙ্গলবার কোমে এবং বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় একই ধরনের শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, ‘শহীদ নেতা’র মরদেহ কোমে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ শহরটিতে আনার ভিডিওও প্রকাশ করা হয়।
এএফপির ছবিতে দেখা যায়, তেহরানের প্রধান সড়কগুলো মানুষে পরিপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার মতোই এবারও লাখো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছেন।
তবে টানা ছয় দিনের শোকানুষ্ঠানের তৃতীয় দিনেও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি খামেনির উত্তরসূরি ও ছেলে মোজতবা খামেনিকে। বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর তাঁকে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হলেও এরপর থেকে তিনি জনসম্মুখে আসেননি।
কালো পোশাকে শোকাহত মানুষ কফিনগুলোর ওপর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেন। কফিনগুলোর মধ্যে ছিল মাত্র ১৪ মাস বয়সী খামেনির নাতনির ছোট্ট কফিনও, যিনি ওই হামলায় নিহত হন।
৬৩ বছর বয়সী এক শোকাহত ব্যক্তি, যার পরিচয় শুধু কাজেমি নামে দেওয়া হয়েছে, বলেন, ‘আমরা শহীদদের এবং আমাদের শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধ নেব।’
শোকযাত্রায় অনেকের হাতে ছিল শিয়া ইসলামে প্রতিশোধের প্রতীক লাল পতাকা। পাশাপাশি ‘কিল ট্রাম্প’ স্লোগান এবং মোজতবা খামেনির ছবিও বহন করতে দেখা যায়।
২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেলিকা নুরিয়ান বলেন, ‘আমরা আলী খামেনিকে কতটা ভালোবাসতাম এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র, জনগণ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি কতটা অঙ্গীকারবদ্ধ—তা বিশ্বকে জানাতেই আমি গর্বের সঙ্গে এখানে এসেছি।’
‘শত্রুদের জন্য বার্তা’
আরেকটি ট্রাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিহত ইরানি ও ইরান-সমর্থিত নেতাদের ছবি প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানি।
প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের ওপর ট্রাক থেকে পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এক্সে লিখেছেন, ‘শহীদ নেতার নেতৃত্ব আমাদের শিখিয়েছে, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ ও তাদের ঐক্য।’
শোভাযাত্রায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই, কুদস ফোর্সের বর্তমান প্রধান ইসমাইল কানি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের জোলকদর বলেন, ‘লাল পতাকা হাতে লাখো মানুষের উপস্থিতি এবং প্রতিশোধের দাবির স্লোগান ইরানের শত্রুদের জন্য স্পষ্ট বার্তা।’
সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেও শোকযাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে শেষ দিকে খামেনির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
মোজতবাকে ঘিরে জল্পনা
আগের দিনের মতো এদিনও মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি তাঁর অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। ফলে শেষকৃত্যে তিনি উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় মোজতবা খামেনি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে এজেইকে পুনর্নিয়োগ দেন।
বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের জন্মশহর মাশহাদে খামেনির দাফনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শেষ হবে। সেখানে মোজতবার উপস্থিতি থাকবে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে সবার।
সরকার যুদ্ধ-পরবর্তী এই ব্যাপক জনসমাগমকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে একই সঙ্গে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির জানাজায় পদদলিত হয়ে ১০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতেও সতর্ক রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান জাফর মিয়াদফার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত শোকানুষ্ঠানে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
0 মন্তব্য