নতুন পাটের দাম বাড়লেও অতিবৃষ্টির কারণে ফলন কম হওয়ায় বছরের খোরাকি জোগাড়ের চিন্তায় দিশেহারা কৃষক। উত্তরাঞ্চলের বন্যাকবলিত অন্যান্য জেলার মতো লালমনিরহাটের বাজারেও মৌসুমের নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় বাজারদর ভালো থাকলেও অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে পাটগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় ফলন কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের দাবি, এ বছর অধিকাংশ পাটগাছের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কমেছে। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত আঁশ উৎপাদন কমেছে। সাধারণত পাটগাছের উচ্চতা ৭ থেকে ১৩ ফুট হলেও এবার অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা অর্জিত হয়নি।
জেলার সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ের হাটে অল্প পরিমাণে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় পাটগাছের উচ্চতা মাত্র ৩ থেকে ৫ফুট হয়েছে, আবার কোথাও ৬ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত বেড়েছে। কৃষকরা পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো এবং বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পাটের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জেলা সদরের পাট ব্যবসায়ী আক্কাস আলী বলেন, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় কিনলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার পাটের বাজারদর কিছুটা বেশি।
আদিতমারী উপজেলার কৃষক আমির আলী বলেন, তিনি প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক সন্তোষ রায় বলেন, বর্তমান বাজারদর সন্তোষজনক হলেও এই দাম কতদিন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। কারণ, এখনও আরও পাট জাগ দেওয়া বাকি রয়েছে।
পাটের উৎপাদন ও আয়-ব্যয় নিয়ে বাসসের সঙ্গে আলাপকালে সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক ও কীটনাশক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান (৪২) বলেন, এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে পাট চাষে প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে অতিবৃষ্টির কারণে এ বছর পাটগাছের স্বাভাবিক উচ্চতা বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় ফলন কমেছে। এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৬ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা হিসেবে ৬ মণ পাট বিক্রি করে ২৪ হাজার টাকা পাওয়া যায়। উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে তিন মাসের পরিশ্রমে এক বিঘা জমিতে লাভ থাকে মাত্র ৮ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করে যে লাভ হয়, তা দিয়ে ছয় সদস্যের একটি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। তাই কৃষকদের আর্থিকভাবে সহায়তা করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক কাশেম মিয়া বলেন, প্রতি মণ পাট উৎপাদনে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। দাম কিছুটা বাড়লেও লাভ খুব বেশি নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭৩০ হেক্টর বেশি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৫৪৯ মেট্রিক টন।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ বলেন, বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাটগাছের স্বাভাবিক উচ্চতা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, নতুন পাটের বাজারদর ভালো রয়েছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় উৎপাদন কমলেও অনেক স্থানে সন্তোষজনক ফলনের আশা রয়েছে।
0 মন্তব্য