ইরানের রাজধানী তেহরানে গতকাল রবিবার মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় শহীদ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় গোটা এলাকা বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
লাখো অংশগ্রহণকারী ধর্মীয় বাণী আওড়ে এবং বুক চাপড়ে এই শহীদ নেতার প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। শহীদ নেতা ও তাঁর স্বজনদের এই জানাজার সময় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জানাজা শেষে খামেনির কফিন গ্র্যান্ড মোসাল্লার ভেতরে নেওয়া হয়েছে। জানাজায় ইমামতি করেন আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী।
গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এ জানাজা তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে আয়াতুল্লাহ খামেনির জন্য নামাজ আদায় করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে তাঁর পরিবারের সদস্য সাইয়্যেদে বুশরা হোসেইনি খামেনি, মেসবাহ আল-হোদা বাকেরি এবং জাহরা হাদ্দাদ আদেলের জন্য জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় ধাপে তাঁর নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির জন্য জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
আয়াতুল্লাহ খামেনির নিহত হওয়ার পর শনিবার ভোর থেকে ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় বিদায়ি অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইরানিদের পরনে ছিল কালো পোশাক, হাতে ছিল দেশটির লাল-সাদা-সবুজ পতাকা। ইরানি কর্তৃপক্ষ এর আগে বলেছে, শহীদ এই নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে শুধু তেহরানেই এক কোটির বেশি মানুষ উপস্থিত হবে।
জানাজায় শরিক খামেনির তিন ছেলে : খামেনির জানাজার নামাজে তাঁর তিন ছেলে মাসউদ খামেনি, মেইসাম খামেনি ও মোস্তফা খামেনি অংশ নিয়েছেন।
মরহুম নেতার জানাজার এই বিশেষ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি উপস্থিত ছিলেন।
সামরিক এই কর্মকর্তার উপস্থিতিতে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জানাজার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। তবে খামেনির আরেক ছেলে এবং তাঁর দাপ্তরিক উত্তরাধিকারী মোজতবা খামেনি এই জানাজার নামাজে সশরীরে অংশ নেননি। ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মোজতবার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আসা সাম্প্রতিক সম্ভাব্য জীবননাশের হুমকির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি : খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেওয়ায় বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি সম্মান জানাতে ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিরা হাজির। তাঁদের মধ্যে আমাদের আস্থাভাজন আরব ভাইয়েরাও রয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতিতে আনন্দিত ইরান।’
শহীদ নেতাকে কখনো বিদায় জানাব না : গতকাল শহীদ নেতার জানাজার দিনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘আমি শহীদ নেতাকে বিদায় জানাইনি এবং কখনোই জানাব না। তিনি আমার হৃদয়, চিন্তা ও আমার সামনে সব সময় জীবন্ত এবং চিরকাল জীবন্ত থাকবেন।’
কঠোর নিরাপত্তা : কয়েকটি হেলিকপ্টার সর্বক্ষণ মোসাল্লার ওপর দিয়ে চক্কর দিয়েছে। পুরো মোসাল্লা এবং চারপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে জনসমুদ্রকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ড্রোন, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নজরদারি—সবকিছু মিলিয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়। আকাশে চক্কর দেওয়া হেলিকপ্টারগুলো নিরাপত্তা ও তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত ছিল। জনতার মহাসমুদ্র দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছে সিএনএন, এবিসি নিউজ ও রয়টার্স। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এর আগে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনীহা ও অনাস্থার কথা ফলাও করে প্রচার করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তির প্রতীক : জানাজা, শ্রদ্ধা ও শোক জানানোর ঐতিহাসিক দিনকে নিয়ে সাবেক ইসরায়েলি এক কর্মকর্তাও বলেছেন, ইরানের কোটি কোটি জনতার এ শোক ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তির প্রতীক।
মানুষের কান্নায় বিস্মিত ট্রাম্প : খামেনির শেষবিদায়ে ইরানিদের কান্না দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি ভাবতেন মানুষ খামেনিকে ‘ঘৃণা’ করে। তবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তিনি বলেন, হতে পারে ওগুলো সব মায়াকান্না। মার্কিন স ংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
ট্রাম্প বলেন, খামেনির শেষবিদায়ি অনুষ্ঠান চলাকালে দেশটির অবশিষ্ট নেতৃত্বকে ‘এক হামলায়’ নির্মূল করা সম্ভব। তবে তিনি বলেছেন, তা করবেন না। কারণ তাহলে আলোচনার জন্য ‘কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।’
ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ড দাবি : খামেনির জানাজায় ইরানিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে। ইরানের রাজধানীতে লাখো শোকাহত মানুষের ভিড়ে ট্রাম্পকে হত্যার ডাক উঠেছে। জানাজায় অংশ নেওয়া ৪২ বছর বয়সী নার্স জিবা নাদেরি বলেছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যা আদেশ দেবেন, ইরানিদের তা-ই মেনে চলতে হবে। ‘আমি প্রতিশোধের ডাক শুনেছি; কিন্তু আমাদের নেতাকেই বলতে হবে আমাদের কী করতে হবে এবং আমাদের অবশ্যই তাঁর কথা শুনতে হবে।’
জানাজার সংকেতগুলোর অর্থ : খামেনির জানাজায় শোকাহতরা ব্যাপকভাবে লাল ব্যানার ও পতাকা প্রদর্শন করেছেন, যা নিহত নেতার রক্তের প্রতিশোধের দাবিতে শিয়াদের একটি শক্তিশালী প্রতীক। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লাজুড়ে ‘ইয়া লাথারাত আল-হুসাইন’ (হে হুসাইনের প্রতিশোধকগণ) এবং সদ্য উদ্ভাবিত ‘ইয়া লাথারাত আল-খামেনি (হে খামেনির প্রতিশোধকগণ)-এর মতো স্লোগান লেখা লাল পতাকা দেখা গেছে। শেষোক্ত বাক্যাংশটি সপ্তম শতাব্দীর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি ইমাম হুসাইনের শোককে একীভূত করে, যা ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালায় শহীদ হওয়া শিয়া পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু এবং নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর স্মরণ করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে ‘ইয়া লাথারাত আল-হুসাইন’ ধ্বনিটি শিয়া যোদ্ধাদের প্রতিশোধের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে ব্যবহূত হয়ে আসছে এবং খামেনির নামের সঙ্গে এর অভিযোজনটি তাঁর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের একটি সরাসরি আহবানকে নির্দেশ করে।
শেষে যা থাকছে : শোকমিছিল শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কোম নগরীতে। এরপর বুধবার কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তাঁর প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন। অনুষ্ঠিত হবে জানাজা। এরপর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ তাঁর জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ফিরিয়ে আনা হবে। সেখানেই তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
৭০ লাখের বেশি ট্রিপ : খামেনির শেষবিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরান মেট্রোতে ৭০ লাখের বেশি ট্রিপ রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির আধ-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। প্রতিবেদন তথ্য মতে, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে গতকাল সকাল ৭টা পর্যন্ত তেহরান মেট্রো নেটওয়ার্কে ৭০ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছে। এই যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শেষবিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে।
হরমুজ প্রণালিতে বিশেষ সুবিধা : চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদুর রেজা রহমানি ফাজলি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর নতুন করে সার্ভিস ফি আরোপ করতে যাচ্ছে তেহরান। তবে চলমান সংকটে যেসব দেশ ইরানের পাশে ছিল, সেগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ইরানের : নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাংলাদেশের গভীর শোক পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং এই কঠিন সময়ে ইরানের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সংহতির ওপর জোর দেন।
খলিলুর রহমান বলেন, আঞ্চলিক শান্তি এই অঞ্চল এবং এর বাইরের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বৈঠকে উভয়পক্ষ দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করেছে।
0 মন্তব্য