দক্ষিণ জাপানে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। হাজারো বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সড়কে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন।
ভূমিকম্পের প্রায় এক ঘণ্টা পর কুমামোতো শহরের কাছে আংশিক ধসে পড়া একটি শপিংমলে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিশের কোঠার দুই নারী নিহত হন। তবে ধ্বংসস্তূপ থেকে ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন মলটির ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, এখনও অনেক মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, শপিংমলটিতে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। উদ্ধারকারীরা ভবনের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তাধীন। প্রায় ১৭০ সেনাসদস্যসহ দমকল, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল ভবনের যেসব অংশ থেকে সাহায্যের আহ্বান এসেছে সেখানে অভিযান চালাচ্ছে। পুরো ভূমিকম্প–কবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজে মোতায়েন করা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি সেনা।
এদিকে একটি নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানার চিমনি ধসে আরও ৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন এবং ৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েক ডজন আহত ব্যক্তির চিকিৎসা চলছে।
কুমামোতো প্রিফেকচারে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। ভূমিকম্পের পর পুলিশ ৩৮৬টি জরুরি কল পেয়েছে, যার বেশিরভাগই ভবন ধস ও আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের অনুরোধ।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল কুমামোতো শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। এলাকাটিতে আগামী এক সপ্তাহ শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ভূমিধসের ঝুঁকির কথাও জানানো হয়েছে।
এখনও ৩৬ হাজারের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কয়েকটি হাসপাতাল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছে না। একটি হাসপাতাল নিজেদের অবস্থা "ফিল্ড হাসপাতালের মতো" বলে জানিয়েছে। আরেকটি হাসপাতাল ৮৬ জন আহতকে চিকিৎসা দেওয়ার পর নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ রেখেছে।
ভূমিকম্পের সময় চলন্ত বুলেট ট্রেনের কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
কুমামোতোর বৃহত্তম এইওন শপিংমল, যেখানে প্রায় ২০০টি দোকান রয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনের এক পাশ ধসে ইস্পাতের বিম উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং পার্কিং এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাবশেষ।
ভূমিকম্পের পর সনি, টোকিও ইলেকট্রন ও হোন্ডা তাদের স্থানীয় কারখানার কার্যক্রম বুধবার পর্যন্ত স্থগিত করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা টিএসএমসিও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কর্মীদের সরিয়ে নেয়, তবে পরে সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু করে।
উল্লেখ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার' অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বে ৬.০ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্পই জাপানে সংঘটিত হয়। ১০ বছর আগে কুমামোতোতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন। এবারের ভূমিকম্পেও ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গসহ বেশ কয়েকটি পুরোনো মন্দির ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
0 মন্তব্য