জেলার দাকোপ উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা পল্লব গাইন (২৩) হাঁসের খামার করে স্থানীয় তরুণদের মাঝে অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া চাড়ারধার গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা পল্লব গাইন হাঁসের খামার করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে উপজেলার অনেক বেকার যুবক ছোট-বড় আকারের হাঁসের খামার গড়ে তোলার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তুলনামূলকভাবে কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় অনেকেই হাঁস পালনে ঝুঁকছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছোটবেলায় বাবা জয়দেব গাইনের হাঁস-মুরগির খামার পরিচালনা করতে দেখে পল্লবের মনেও হাঁস পালনের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এইচএসসি পাস করার পর তিনি চাকরির খোঁজ না করে আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকতায় পল্লব ও তার বাবা যৌথভাবে একটি খামার পরিচালনা শুরু করেন। বর্তমানে এ খামারে প্রায় ১ হাজার হাঁস এবং উন্নত জাতের চারটি গরু রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭শ’ হাঁস ডিম দেয়। বাজারের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দামের ওঠানামা থাকলেও স্থানীয় বাজারে প্রতিটি ডিম গড়ে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়।
তরুণ উদ্যোক্তা পল্লব গাইন বলেন, হাঁসের বাচ্চা কেনা থেকে শুরু করে ডিম পাড়ার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত একটি হাঁস লালন-পালনে প্রায় ৪৫০ টাকা খরচ হয়। খাদ্য ও পরিচর্যা বাবদ যাবতীয় খরচ মেটানোর পর এ খামার থেকে মাসে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।
তিনি বলেন, এইচএসসি পাস করার পর বেকার বসে না থেকে বাবার অনুপ্রেরণায় আমি নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নিই। আর এরই অংশ হিসেবে হাঁসের খামার শুরু করি। হাঁস পালনে বিনিয়োগ কম, অথচ ভালো আয় করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন পল্লব।
তার বাবা জয়দেব গাইন বলেন, আগে তিনি একটি পোল্ট্রি খামার চালাতেন, যেখানে কখনো লাভ হতো আবার কখনো লোকসান গুণতে হতো। ছেলের আগ্রহ দেখে তিনি নিজেও পল্লবের সাথে হাঁস ও দুগ্ধ খামারের কাজে যুক্ত হন।
তিনি বলেন, আমাদের বাবা-ছেলের যৌথ প্রচেষ্টায় আমরা এখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য দীনবন্ধু মণ্ডল বলেন, এলাকার অনেক তরুণ যখন কর্মসংস্থানের জন্য হিমশিম খাচ্ছে, তখন নিজস্ব উদ্যোগে স্বাবলম্বী হয়ে পল্লব এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার সাফল্য দেখে এখন গ্রামের অনেকে হাঁস ও গবাদি পশু পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
অপরদিকে, জেলার বেকার তরুণ ও গৃহবধূদের জন্য হাঁস পালন আয়ের একটি সম্ভাবনাময় উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও হাঁস পালনের কাজে ক্রমশ সম্পৃক্ত হচ্ছেন। দ্রুত বৃদ্ধি ও অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য পরিচিত ‘পেকিন’ (বেইজিং) জাতের হাঁস নারীদের মধ্যে বিশেষ প্রিয়। অনেক গ্রামীণ গৃহবধূ আধুনিক পদ্ধতিতে প্রায়শই খাঁচায় বা বাঁশের মাচায় এসব হাঁস পালন করছেন।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দাকোপ উপজেলাজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২২০টি হাঁসের খামার রয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
বাজুয়া চরারধার গ্রামের গৃহবধূ শাহনাজ বেগম বলেন, তিনি পল্লবের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘পেকিন’ জাতের হাঁস পালন করে ভালো আয় করছেন।
উপজেলার পানখালি গ্রামের হাঁস খামারি মহিউদ্দিন কাজী জানান, তিনি ঘরের কাজের পাশাপাশি একটি হাঁসের খামারও পরিচালনা করেন। প্রতি কেজি পেকিন হাঁস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। ১০০টি হাঁস বিক্রি করার পর আয়ের প্রায় অর্ধেকই লাভ থাকে।
দাকোপ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার মজুমদার বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে হাঁস ও গবাদি পশু পালনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পল্লব ও তার বাবার এ যৌথ উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ তাদের টিকাদান, চিকিৎসা ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী যে কাউকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।
তিনি জানান, দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বনির্ভরতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে গ্রামীণ এলাকায় হাঁস পালনকে উৎসাহিত করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক খাবার ও পরিচর্যা পেলে পেকিন হাঁসের ওজন ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে ৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে স্বল্প সময়ে হাঁস পালন একটি অত্যন্ত লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দাকোপ উপজেলা এবং খুলনার অন্যান্য এলাকায় হাঁস পালন একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষকে টেকসই হাঁস-মুরগি পালন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব।
0 মন্তব্য