দেখতে ছোট, গোল বা ডিম্বাকার। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও ফলটি কাটতেই দেখা যায় ভিন্ন এক জগৎ। ভেতরে অসংখ্য বীজ ঘিরে থাকে রসালো শাঁস। স্বাদে টক-মিষ্টি। নাম তার প্যাশন ফ্রুট। অঞ্চলভেদে আনারকলি বা ট্যাং নামেও পরিচিত এই ফল এখন আর শুধু বিদেশি ফলের তালিকায় নেই, বাংলাদেশের মাটিতেও জায়গা করে নিচ্ছে।
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েকে প্যাশন ফ্রুটের আদি নিবাস হিসেবে ধরা হয়। বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় গাছে ধরে এই ফল। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে গাছ বেশ কয়েক বছর ফল দিতে পারে। ফলের ভেতরের রসালো শাঁস সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, শরবত, ডেজার্টসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশে এই ফলের সঙ্গে পরিচয়ের গল্পও বেশ পুরনো। ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের কাজ করতে গিয়ে বহু বছর আগে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে কৃষক আব্দুল আজিজের বাড়িতে প্রথম প্যাশন ফ্রুট দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখন এটি ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী একটি ফল। দেশের মাটিতে এর চাষ সম্ভব এই ধারণাটিও তখন নতুন ছিল।
২০২২ সালে মালদ্বীপের আড্ডু দ্বীপে গিয়ে দেখা পেয়েছিলাম আরো বড় আকারের প্যাশন ফ্রুটের।
আকারে বড়, দেখতে আকর্ষণীয় সেই ফল নজর কেড়েছিল। উদ্যোক্তা বলেছিলেন, ট্যুরিস্টদের কাছে দারুণ চাহিদা এই ফলের। পরের বছর কক্সবাজারের একটি ছাদকৃষিতেও একই ধরনের বড় আকারের প্যাশন ফ্রুট উৎপাদন হতে দেখেছি। সময় গড়িয়েছে। প্যাশন ফ্রুটও ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
তবে এবার গল্পটি একটু ভিন্ন। বড় আকারের এই প্যাশন ফ্রুট আর বিচ্ছিন্নভাবে শখের চাষে সীমাবদ্ধ নেই। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ। জানা গেছে, জীবননগর উপজেলায় এবার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে প্যাশন ফ্রুটের চাষ করেছেন কৃষক আবুল বাশার। কৃষকের আগ্রহ এবং স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে নতুন এই ফলকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র।
কৃষকের জন্য নতুন কোনো ফসল মানেই কিছুটা ঝুঁকি। পরিচিত ধান, গম, সবজি বা প্রচলিত ফলের বাইরে নতুন ফসল আবাদ করতে গেলে বাজার, উৎপাদন খরচ, ফলন এবং বিক্রির নিশ্চয়তা সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হয়। প্যাশন ফ্রুটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়।
তবে এই ফলের একটি বড় সুবিধা হলো দেশের বাজারে এর পরিচিতি তৈরি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন বাজার, সুপারশপ, জুস ও ফুড প্রসেসিং খাতে প্যাশন ফ্রুটের ব্যবহার রয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়লে স্থানীয়ভাবে বাজার তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, নতুন ফসলের সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। কোন মাটিতে ফলন ভালো হচ্ছে, কী ধরনের পরিচর্যা প্রয়োজন, রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকি কতটা, উৎপাদন খরচ কেমন এবং বাজারে দাম কেমন পাওয়া যাচ্ছে এসব তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে বড় পরিসরে চাষের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
প্যাশন ফ্রুটের চাষে লতানো গাছের জন্য প্রয়োজন হয় মাচা বা উপযুক্ত কাঠামো। ফলে প্রচলিত ফসলের তুলনায় শুরুতে কিছু বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। আবার বহুবর্ষজীবী গাছ হওয়ায় সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ শুরুতে বিনিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ের উৎপাদন, দুই দিক থেকেই কৃষকের হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন ফলের আগমন অবশ্য নতুন কিছু নয়। একসময় বিদেশি বলে পরিচিত অনেক ফলই এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত হচ্ছে। ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা, স্ট্রবেরিসহ নানা ফলের চাষে কৃষকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই ধারায় প্যাশন ফ্রুটও জায়গা করে নিতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে উৎপাদন ও বাজারের ওপর।
একসময় যে ফলকে বাংলাদেশের বাজারে মূলত বিদেশি ফল হিসেবেই দেখা হতো, সেটিই এখন দেশের মাটিতে ফলছে। কৃষকের নতুন আগ্রহ, স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহযোগিতা এবং বাজারে চাহিদা এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগোতে পারলে টক-মিষ্টি স্বাদের প্যাশন ফ্রুট হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন একটি বাণিজ্যিক ফসল।
0 মন্তব্য