ভারতের বেঙ্গালুরুতে ভোর ৫টা। অ্যাপলের দোকানের সামনে ফুটপাতে অপেক্ষা করছেন রাহুল নামে এক ব্যক্তি। তার কাছে এটি শুধু নতুন ফোন কেনার দিন নয়, এক ধরনের ‘উৎসব’। ভোর হওয়ার আগেই তিনি দোকানের সামনে চলে এসেছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন হরিয়ানা, দিল্লি ও মুম্বাই থেকে আসা আরও অনেক আইফোনপ্রেমী। প্রতিবছর নতুন আইফোন বাজারে আসার দিনটিতে এই ভিড়ের অংশ হতে চান তারা।
এনডিটিভির প্রতিবেদন জানায়, একই দৃশ্য দেখা গেছে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের মুম্বাইয়েও। নাশিক থেকে আসা এক ব্যক্তি আগের রাত ১০টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জানতেন, শেষ পর্যন্ত ফোন কেনার সুযোগ পাবেন। তারপরও লাইনের একেবারে সামনে থাকতে চেয়েছেন।
কারণ, তার লক্ষ্য ছিল সকালে প্রথম দিকের ফোন সরবরাহের সময় পাওয়া। ঘটনাটি ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের। অথচ আইফোন কেনার জন্য দোকানের সামনে রাত কাটানোর বাস্তব কোনো প্রয়োজন ছিল না। অ্যাপলের ওয়েবসাইটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আইফোন ১৮ প্রো কেনার অর্ডার দেওয়া যায়। ফোনটি কুরিয়ারের মাধ্যমে বাড়িতেও পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর বাইরে বিগবাস্কেট ও ব্লিঙ্কইটের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মও আইফোন ১৮ প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তারপরও দিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর রাস্তায় নতুন আইফোন কেনার জন্য রাত কাটাতে দেখা গেছে মানুষকে।
চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরেও ভোর হওয়ার আগেই অ্যাপলের দোকানের সামনে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। চীনের সাংহাইয়ে পরিস্থিতি ছিল আরো ব্যস্ত। দোকান খোলার আগেই নতুন আইফোনের আগাম বিক্রির মজুত শেষ হয়ে যায়। এর আগের সপ্তাহে জেডি ডটকম, তাওবাও এবং অ্যাপলের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিক্রি শুরু হওয়ার প্রায় এক মিনিটের মধ্যেই সব ফোন বিক্রি হয়ে যায়। অতিরিক্ত ক্রেতার চাপের কারণে কিছু সময়ের জন্য কোম্পানির সার্ভারেও সমস্যা দেখা দেয়।তবে নতুন আইফোন বাজারে আসার সকালে দোকানের সামনে দাঁড়ানো অনেক ক্রেতা সরাসরি ফোন কিনতে পারছিলেন না। তারা শুধু পরবর্তী সময়ে দোকান থেকে ফোন নেওয়ার জন্য সময় বুক করার সুযোগ পাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই ফোন পুনরায় বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের একটি দল দোকানের আশপাশে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নতুন আইফোনের জন্য মানুষের এমন ভিড়কে শুধু ভোক্তাদের এমন আচরণ অ্যাপলের বাজার কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ বছর অ্যাপল সাধারণ আইফোন ১৮ বাজারে আনেনি। ফলে নতুন আইফোন কেনার আগ্রহের বড় অংশই প্রো মডেলের দিকে চলে গেছে। এর পাশাপাশি জনপ্রিয় রঙ ও বেশি ধারণক্ষমতার মডেলের প্রাথমিক মজুতও সীমিত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নতুন ফোন আসার তিন থেকে চার সপ্তাহ পর সাধারণত সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই প্রথম দিকে যে সংকট দেখা যায়, তার পেছনে উৎপাদনে বড় সমস্যা থাকার চেয়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
অ্যাপল নতুন ফোন বাজারে ছাড়ার সময় ও সরবরাহের গতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের আগ্রহ বাড়ায়। ফোন পুনরায় বিক্রি করা ব্যবসায়ীরা প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নিজেদের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফোন সংগ্রহ করেন। এরপর সীমিত সরবরাহের কারণে পুনর্বিক্রির বাজারে দাম আরো বেড়ে যায়। আর সাধারণ ক্রেতাদের একটি অংশ সবার আগে ফোন পাওয়ার জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করেন।
অর্থনীতিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোকে ঘিরে একটি পরিচিত ধারণা রয়েছে। কোনো পণ্যের জন্য দোকানের বাইরে মানুষের দীর্ঘ লাইন অনেক সময় ওই পণ্যটির প্রতি মানুষের আগ্রহেরই একটি দৃশ্যমান সংকেত হয়ে ওঠে। একটি দোকানের সামনে শত শত মানুষের লাইন দেখলে অন্য মানুষের মধ্যেও ধারণা তৈরি হতে পারে যে, পণ্যটির চাহিদা অনেক বেশি। অপেক্ষা করার মনস্তত্ত্ব নিয়েও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কিছুর জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে সেটির মূল্য মানুষের কাছে আরো বেশি মনে হতে পারে। ফোন হাতে পাওয়ার মুহূর্তে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। এরপর ফোনের বাক্স খোলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি ফোন কেনার ঘটনা তখন আর শুধু ব্যক্তিগত কেনাকাটা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট। এখানেই বিষয়টি শুধু পণ্য বিক্রির গল্প না থেকে মানুষের আচরণের গল্প হয়ে ওঠে।
দিল্লির ক্রাইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. অভিনব পি ত্রিপাঠী বলেন, অর্থনীতিতে এমন পণ্যের কথা বলা হয়, যেগুলোর দাম বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা বাড়তে পারে। কারণ এসব পণ্যের দাম ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, অতীতে মানুষ অর্থ ও সময় খরচ করার ক্ষমতা দেখিয়ে সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই আচরণের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। একটি নতুন আইফোন কেনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো এবং সেই মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করাও এখন এক ধরনের সামাজিক পরিচয় প্রকাশের উপায় হয়ে উঠতে পারে। অ্যাপলের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মানুষের ক্ষেত্রে তাই শুধু ফোন কেনাই বিষয় নয়। অনেকের কাছে লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাও পুরো কেনাকাটার অংশ হয়ে গেছে।
ড. ত্রিপাঠী বলেন, বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে অ্যাপল ব্যবহারকারীদের ব্র্যান্ডের প্রতি তীব্র আনুগত্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। অনেক আইফোন ব্যবহারকারী মনে করেন, অন্য ব্র্যান্ডের ফোনে যাওয়ার কথা তারা সহজে ভাবতে পারেন না। তার মতে, এর ফলে আইফোন ব্যবহার অনেকের কাছে শুধু একটি ফোন বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। এটি ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশও হয়ে উঠেছে। তবে নতুন আইফোন বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর ফোন বদলানোর প্রবণতাটি বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের আচরণ নয়। বরং মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি সময় ধরে স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। শিল্প খাতের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে একটি স্মার্টফোন বদলানোর গড় সময় প্রায় চার বছরের দিকে যাচ্ছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ স্মার্টফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও মেমোরির দাম বেড়ে যাওয়া। এতে নতুন ফোনের দামও বাড়ছে।
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে মানুষ গড়ে প্রতি ২ দশমিক ৪ বছর পর ফোন বদলাতেন। ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই সময় বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বছরে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মানুষ এখন আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি সময় একটি ফোন ব্যবহার করছেন। গ্রাহকেরা ঘন ঘন ফোন বদলাতে না চাইলেও অ্যাপল ও স্যামসাং নতুন ফোন কেনার সুযোগ সহজ করতে কিস্তি ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে। অ্যাপলের কিস্তি সুবিধা এবং ভারতে স্যামসাংয়ের ‘গ্যালাক্সি ফরএভার’ পরিকল্পনা এর উদাহরণ। এর ফলে একটি বড় অঙ্কের টাকা একবারে খরচ না করে গ্রাহক মাসে মাসে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে নতুন ফোন কিনতে পারেন। তবে এতে ফোনের মোট দাম কমে যায় না। শুধু পুরো টাকা পরিশোধের সময়টি বদলে যায়। এই কারণে অ্যাপলের দোকানের বাইরে রাত কাটানো মানুষকে বিশ্বের সব স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায় না। তাদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাপলের একনিষ্ঠ ভক্ত, ফোন পুনরায় বিক্রি করা ব্যবসায়ী, কনটেন্ট নির্মাতা এবং এমন কিছু ক্রেতা, যাদের কাছে প্রতিবছর নতুন ফোন কেনা একটি বিশেষ অভ্যাস বা আয়োজন।
‘আইফোন বাজারে আসার দিনটি উৎসবের মতো’—এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আইফোনপ্রেমীর অভিজ্ঞতা। সবার জন্য এটি স্বাভাবিক চিত্র নয়। বেশির ভাগ মানুষের জন্য প্রতি বছর ফোন বদলানোর প্রয়োজন নেই। একটি ভালো স্মার্টফোন তিন থেকে চার বছর বা তারও বেশি সময় ব্যবহার করা সম্ভব। অর্থের দিক থেকেও দীর্ঘ সময় একই ফোন ব্যবহার করা অনেকের জন্য বেশি সুবিধাজনক। তবে যারা নতুন আইফোনের জন্য লাইনে দাঁড়ান, তাদের কাছে বিষয়টি শুধু ফোনের প্রযুক্তি বা নতুন ফিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি অভ্যাস, একটি পরিচয়, অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুভূতি এবং সবার আগে নতুন পণ্য পাওয়ার আনন্দ। অর্থাৎ নতুন আইফোনের জন্য দীর্ঘ লাইনকে শুধু ‘ফোন কেনার লাইন’ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি পাওয়া যায় না। এখানে কাজ করে ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, নতুন কিছু সবার আগে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক পরিচয় তৈরির প্রবণতা।
ভারতে আইফোন ১৮ প্রোর দাম শুরু হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯০০ রুপি থেকে। আর ২ টেরাবাইট ধারণক্ষমতার প্রো ম্যাক্স মডেলের দাম ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯০০ রুপি। মাসে ১ লাখ রুপি আয় করেন এমন একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে দামি মডেলটির দাম তিন মাসের বেশি মোট বেতনের সমান। অর্থনীতিবিদ সুনিসা আরিন্তা বলেন, যেসব দেশে নতুন ফোন বাজারে আসার দিন মানুষের ভিড় দেখা যায়, সেসব জায়গায় সাধারণত কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগও থাকে। তার মতে, বড় একটি খরচকে ছোট ছোট মাসিক কিস্তিতে ভাগ করলে ফোনটির প্রকৃত দাম কমে না। শুধু কখন এবং কীভাবে টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে, সেটি বদলে যায়। ফলে নতুন আইফোন হাতে পাওয়ার আনন্দের আড়ালে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। কিছু ক্রেতার আর্থিক সামর্থ্য এত বেশি যে, কয়েক লাখ রুপির একটি ফোন তাদের জন্য বড় কোনো চাপ নয়। আবার অন্য কেউ কিস্তিতে এমন একটি ফোন কিনতে পারেন, যার মাসিক খরচ পরবর্তী ১২ থেকে ১৮ মাসে তার আয়-ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
0 মন্তব্য