রাজধানীর সোয়ারীঘাটে বুড়িগঙ্গা মঞ্চ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত জাতীয় নদী দিবস উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য সাইকেল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। “নোঙর ট্রাস্ট” ও বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের যৌথ আয়োজনে এ শোভাযাত্রায় বিভিন্ন সংগঠনের শতাধিক সাইক্লিস্ট অংশগ্রহণ করেন।
নদী রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন নোঙর ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও নদী আন্দোলনের সংগঠক সুমন সামস।
আলোচনা সভায় “জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনা” বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশের কৃষি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ—নদীর সঙ্গে দেশের ভাগ্য জড়িত।”
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় ১৪১৫টি ছোট-বড় নদী রয়েছে এবং এসব নদী একেকটি জীবন্ত সত্তা। নদী ব্যবস্থাপনায় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাবে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নে কাজ করছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান খোকন বলেন, “নদী রক্ষা মানে দেশের অস্তিত্ব রক্ষা। নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নদী গবেষক আইরিন সুলতানা, কসমস সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী মেহনাজ পারভীন মালা, ওয়ারপোর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশের বিভিন্ন নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও ঈদকেন্দ্রিক যাত্রায় নৌপথে অনিরাপত্তা ভয়াবহ রূপ নেয়। এ বাস্তবতায় ২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতি বছর ২৩ মে-কে “জাতীয় নদী দিবস” ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে নোঙর ট্রাস্ট।
পরিবেশবাদীরা মনে করেন, নদী রক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার একটি জাতীয় দায়িত্ব। তাদের মতে, নদী দখল ও দূষণমুক্ত করে নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করাই হবে নৌদুর্ঘটনায় নিহত হাজারো মানুষের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুববুস, বুড়িগঙ্গার মঞ্চের জাতীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য কামরুল হাসান চৌধুরী বিপু, কেরানীগঞ্জ ইউনাইটেড সাইক্লিস্টের সভাপতি রফিকুল হাসান, চকবাজার সাইক্লিস্টের নির্বাহী সদস্য কায়সার আহমেদসহ বিভিন্ন সাইক্লিং সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা নদী দূষণ, দখল এবং নৌপথের অনিরাপত্তার বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেন। পরে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্টজন, পরিবেশবিদ, নদী গবেষক এবং সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা একমত পোষণ করেন যে, “নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ” এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং দেশের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
0 মন্তব্য