বাংলাদেশের সৃজনশীল শিল্পকে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা বিকাশ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপান্তর করতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন জাতীয় ব্র্যান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরে (এফওয়াই২৭) এ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের আওতায় ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে দেশের সৃজনশীল সম্ভাবনা তুলে ধরবে এবং দেশীয় সৃষ্টিশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান গড়তে সহায়তা করবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উপস্থাপনায় এ উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালু করা হবে, যা দেশের সৃজনশীল সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে উপস্থাপন করবে। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর স্টুডিও স্থাপন করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য হলো সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং এই খাতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
খাতটির সম্প্রসারণে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।
এই কৌশলে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কর-সুবিধাকে একত্র করে সৃজনশীল উদ্যোক্তা, কনটেন্ট নির্মাতা ও শিল্পীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ফিল্ম স্টুডিও স্থাপন করা হবে।
পাশাপাশি রাজধানীর পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে একটি বিশ্বমানের সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলা হবে।
এর পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মধ্যেও এসব হাবের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।
সরকার দেশীয় কনটেন্ট নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সহায়তা দেবে।
গ্রামীণ পর্যায়ে হস্তশিল্প, তাঁতজাত পণ্য, শীতল পাটি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পেশায় যুক্ত শিল্পীদের ‘ওয়ান-ভিলেজ, ওয়ান-প্রোডাক্ট’ উদ্যোগের আওতায় বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত করা হবে।
খাতটিকে উৎসাহিত করতে বাজেটে কর-সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কনটেন্ট নির্মাণ থেকে অর্জিত সব আয়কে সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত করা হবে এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে।
উচ্চ প্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফি ক্যামেরা ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং বাদ্যযন্ত্রের ওপর সব নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এটিকে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা বিকাশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলো ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের অধীনে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশলগত অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
0 মন্তব্য