হিউস্টনে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর মাঠ ছাড়ছিলেন ব্রাজিলের ফুটবলাররা। তাদের মুখভঙ্গিতেই যেন স্পষ্ট ছিল, দেশের কোটি সমর্থকের মনে তখন কী চলছে। বিশ্বকাপ থেকে আরেকটি অকাল বিদায়ের শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, আর ‘জাতীয় লজ্জা’র মুখোমুখি হতে তখন মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে ছিল ব্রাজিল।
শেষ-৩২ পর্বের ম্যাচে প্রথমার্ধজুড়ে জাপান ছিল অনেক বেশি গোছানো ও আত্মবিশ্বাসী। এগিয়ে যাওয়ার পর তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও ধরে রাখে। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পিছিয়ে পড়ে আর কখনও ঘুরে দাঁড়িয়ে জিততে না পারা ব্রাজিলের জন্য পরিস্থিতি ছিল বেশ কঠিন। বড় ধরনের অঘটনের আশঙ্কাই তখন বাস্তব মনে হচ্ছিল।
কিন্তু যারা কার্লো আনচেলত্তিকে নিয়ে সংশয়ে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন ইতালিয়ান এই কোচ। ক্লাব ফুটবলে তার সাফল্যের তালিকা ঈর্ষণীয়—রেকর্ড পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পাশাপাশি ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগেই শিরোপা জিতেছেন তিনি। ক্লাব পর্যায়ে প্রায় সব বড় ট্রফিই তার অর্জনের ঝুলিতে।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি তার প্রথম কোচিং দায়িত্ব। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের প্রথম বিদেশি কোচও তিনি। তাই প্রথমার্ধ শেষে চাপ অনুভব করাটা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি জানালেন, দলের ওপর তার আস্থা এক মুহূর্তের জন্যও নড়েনি।
‘আমি মোটেও চিন্তিত ছিলাম না। আমার দলের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল,’—বলেছেন আনচেলত্তি।
সেই বিশ্বাসের প্রতিদানও দিয়েছে তার দল। দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পিছিয়ে থেকেও জয় তুলে নেয় ব্রাজিল। ২০০২ সালের সেমিফাইনালে তুরস্ককে হারানোর পর এটিই এমন প্রথম কীর্তি। এই জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে সেলেসাওরা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আইভরি কোস্ট অথবা নরওয়ে।
প্রথমার্ধের বিরতিতে আনচেলত্তি খুব বেশি পরিবর্তন আনেননি। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার বদলে এন্দ্রিককে নামানো ছিল বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত। পরে তিনি স্বীকার করেন, সুসংগঠিত জাপানের বিপক্ষে তার দল কিছুটা সমস্যায় পড়েছিল। তবে সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য তিনি খেলোয়াড়দের ওপরই ভরসা রেখেছিলেন।
আনচেলত্তির ভাষায়, ‘আমাদের দল তখনও মাঠেই ছিল। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথমার্ধের মতো আমরা দিশেহারা হয়ে পড়িনি।’
দ্বিতীয়ার্ধে সেই বিশ্বাসই বাস্তবে রূপ নেয়। একই খেলোয়াড়দের নিয়েই যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্রাজিলকে দেখা যায়। প্রথমার্ধে যে গতি, আগ্রাসন ও বক্সে আক্রমণ তৈরির তাগিদ ছিল না, বিরতির পর তা স্পষ্টভাবে ফিরে আসে।
প্রথমার্ধে ব্রাজিল মাত্র ১২টি ক্রস করেছিল। তারা ছোট ছোট পাসে জাপানের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল বদলে প্রতিপক্ষের বক্সে ২৮টি ক্রস তোলে। এই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ব্যাক পোস্টে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবস্থান বদল এবং ধারাবাহিক ক্রস সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে জাপানের রক্ষণ। সেই কৌশল থেকেই আসে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোল।
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে ইংল্যান্ডের সাবেক ফুল-ব্যাক স্টিফেন ওয়ারনক বলেন, ‘বিরতিতে আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। ব্রাজিলের ক্রসগুলো সামলাতে পারেনি জাপান।’
আক্রমণাত্মক ও স্বাধীনচেতা ফুটবলের জন্য ব্রাজিলের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। আনচেলত্তিও সেই ঐতিহ্য অস্বীকার করেন না। তবে তার মতে, পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলাতে জানাটাও বড় দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শেষ পর্যন্ত আনচেলত্তির পরিকল্পনার পাশাপাশি জাপানের একটি ভুল এবং ব্রুনো গিমারায়েস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির ঠান্ডা মাথার পারফরম্যান্স ব্রাজিলকে জয় এনে দেয়। যোগ করা সময়ের ৯৫ মিনিটে পাওয়া জয়সূচক গোল ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও জিইয়ে রাখে।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলেছিলাম, ফুটবলে ভুল হবেই। কেউই নিখুঁত নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আমার দল সেটাই করেছে।’
এই জয় সহজে আসেনি। কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে ব্রাজিলকে। তবে এমন নাটকীয় জয় দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সমর্থকরাও।
আর আনচেলত্তি? তিনি শুরু থেকেই বিশ্বাস রেখেছিলেন নিজের দল ও পরিকল্পনায়। জয়ের পথটা তিনি জানেন। এই বাধাও তার কাছে ছিল দীর্ঘ যাত্রাপথের আরেকটি ধাপ। অভিজ্ঞ এই ইতালিয়ান কোচের অধীনে ব্রাজিল যে বড় কিছুর স্বপ্ন দেখছে, সেটি এখন আর অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে না।
0 মন্তব্য