তীব্র তাপপ্রবাহের পর এবার ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ ইউরোপের একাধিক দেশ। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর বন ও প্রাকৃতিক এলাকা পুড়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাজারো দমকলকর্মী, শত শত অগ্নিনির্বাপণ যান ও উড়োজাহাজ কাজ করলেও প্রবল বাতাস ও নতুন তাপপ্রবাহের আশঙ্কায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থা ফ্রান্সের স্পেন সীমান্তঘেঁষা পিরেনিজ অঞ্চলে। সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানলের কারণে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, শুষ্ক আবহাওয়া এবং দমকা বাতাসের কারণে প্রায় ৭০০ দমকলকর্মীর অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগুনে কয়েক হাজার হেক্টর বনভূমি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমানে দেশটির পাঁচটি প্রশাসনিক এলাকায় দাবানল সক্রিয় রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি মৌসুমে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে অনেকেই নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া ও আগুনে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা, সৃষ্টি হয় চরম আতঙ্ক।
স্পেনেও দাবানলের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। কাতালোনিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ‘লেস গাভারেস’-এর বড় অংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি কাস্তেলন প্রদেশের ‘সিয়েরা দে এস্পাদান’ জাতীয় উদ্যানে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পাঁচ শতাধিক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পর্তুগালের মধ্যাঞ্চলের ভউজিলা এলাকায় কয়েক দিন ধরে জ্বলতে থাকা দাবানলে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে দেশটির পাশাপাশি স্পেন ও ইতালি সহায়তা পাঠিয়েছে। যদিও আগুনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবু কিছু এলাকায় এখনও ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জরুরি সেবা বিভাগ।
গ্রিসেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। উত্তরাঞ্চলের থেসালোনিকিতে দাবানলে দুটি কারখানা পুড়ে গেছে, যার একটি ছিল প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কারখানা। বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের কয়েকটি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানী এথেন্সের পশ্চিমাঞ্চলেও নতুন করে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে শতাধিক দমকলকর্মী ও বিমান মোতায়েন করা হয়েছে।
দাবানলের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর ডি ফ্রান্স-এর তৃতীয় ধাপেও। নিরাপত্তার কারণে ফিনিশিং লাইনের আশপাশে দর্শকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেবল প্রতিযোগী ও জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ুবিষয়ক গবেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া ও সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ দক্ষিণ ইউরোপে দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
0 মন্তব্য