সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সংলগ্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে পানি প্রবেশ করে আমদানি-রফতানি পণ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের দায় অস্বীকার করায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
রবিবার দেশের চার শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমইএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ও সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক যৌথভাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দরের স্থবিরতা কাটাতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে বাঁচাতে ডেমারেজ মওকুফ ও বিশেষ আর্থিক প্রণোদনাসহ ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন, গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে পানি প্রবেশ করে পণ্যভর্তি কন্টেইনারসহ আমদানি ও রফতানি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি অস্বীকার, বর্জন ও প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি এ বিষয়ে দায় ও জবাবদিহি গ্রহণ না করার অবস্থান জানায়।
এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহৃত ভাষা ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রফতানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি যদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যথায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ এবং পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে আমদানিকৃত তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক ও প্যাকেজিং সামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য আর্দ্রতা সংবেদনশীল পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রফতানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিজাত ও অন্যান্য প্রস্তুত পণ্যের শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় রফতানি আদেশ বাতিল, মূল্যছাড়, বিলম্বজনিত জরিমানা এবং ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।
দীর্ঘ সময় কন্টেইনার ও পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, শেড ও ইয়ার্ড চার্জ, স্টোরেজ ব্যয় এবং শিপিং চার্জ বহন করতে হচ্ছে। কাঁচামাল সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন, প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ, শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি প্রদান, ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক দায়দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং শিল্প সহায়তা নীতির আলোকে ৯টি দাবি জানায় শীর্ষ চার সংগঠন। এগুলো হলো- চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করে আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার প্রদান; চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম হাউস, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন; বন্যা ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বন্দরে আটকে থাকা কন্টেইনার ও পণ্যের ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, স্টোরেজ, শেড, ইয়ার্ড ও সংশ্লিষ্ট শিপিং চার্জ নির্ধারিত সময়ের জন্য সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন চার্জ আরোপ স্থগিত রাখা; কাঁচামাল, রপ্তানি পণ্য, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি ও পচনশীল পণ্যের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, পরীক্ষণ, স্ক্যানিং, মূল্যায়ন ও ডেলিভারির জন্য বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পসুদের বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন এবং জরুরি কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধা চালু করা।
পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সময় বৃদ্ধি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং যৌক্তিক সময়ের জন্য ঋণশ্রেণিকরণে বিশেষ সুবিধা প্রদান; দুর্যোগজনিত কারণে এলসি, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, আমদানি, রফতানি, শিপমেন্ট এবং রফতানিমূল্য প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত নির্ধারিত সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি; ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল এবং কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস শুল্ক, উৎসে কর ও সরকারি ফি পরিশোধে সময় বৃদ্ধি ও বিলম্বজনিত সুদ, জরিমানা ও সারচার্জ মওকুফ, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা তহবিল গঠন; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বা গুণগত মান হারানো আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানি পণ্য ধ্বংস, পুনঃরফতানি, প্রতিস্থাপন কিংবা পুনরায় আমদানির ক্ষেত্রে সহজতর কাস্টমস, বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান।
0 মন্তব্য