কেউ জমিজমা বিক্রি করেছেন, কেউবা ধারদেনা করে পণ্য কিনে গুদামে তুলেছিলেন। তাদের আশা ছিল, ব্যবসার লাভে ঋণ শোধ হবে, ফিরবে সংসারের সচ্ছলতা। কিন্তু এক ভয়াবহ আগুনে মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়েছে তাদের পুঁজি, স্বপ্ন আর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্বল। এখন গুদামভর্তি পণ্যের বদলে পড়ে আছে পোড়া টিন, ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। মাথার ওপর ঋণের বোঝা নিয়ে কিভাবে নতুন করে শুরু করবেন, তা ভেবে দিশাহারা ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার ফলিয়া বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের ফলিয়া বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনা ঘটে। আগুনে পাট, পেঁয়াজ, রসুন, চালসহ বিভিন্ন পণ্যভর্তি অন্তত আটটি গুদাম ও একটি দোকান পুড়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন কোটি টাকা। খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টার ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই গুদামে মজুদ বিপুল পরিমাণ পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফলিয়া বাজারের পাট ও পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মাসুদ মন্ডলের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গুদাম ও দোকানে। গুদামে বিপুল পরিমাণ পাট ও দাহ্য পণ্য থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন।
পাশের বারাশিয়া নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানো হয়। দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে গেছে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য গুদাম মালিকদের মধ্যে রয়েছেন- হাবিবুর রহমান হাবি মন্ডল (৪৫), ফিরোজ মেম্বার (৫৫), মাসুদ মন্ডল (৩৫), মিল্টন মোল্যা (৩০), জুয়েল মন্ডল (৩০), ইমরুল মোল্যা (৩৫) ও কালাম মোল্যা। তাঁদের গুদামে পাট, পেঁয়াজ, রসুন, চালসহ বিভিন্ন পণ্য মজুদ ছিল।
স্থানীয়দের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গুদামে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। আগুনে এসব পণ্যের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. কিসলু খালাসী বলেন, তিনি ফোনে কথা বলছিলেন। হঠাৎ বাজারে মানুষের ছোটাছুটি ও চিৎকার শুনে দোকান থেকে বের হন। তখন মাসুদ মন্ডলের পাটের গুদাম থেকে আগুন ও ধোঁয়া বের হতে দেখেন। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। কিন্তু আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় গুদাম ও দোকানের মালামাল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত অপর ব্যবসায়ী ফিরোজ মেম্বার বলেন, গুদাম বন্ধ করে বাড়িতে যাওয়ার পর আগুনের খবর পান। ঘটনাস্থলে এসে দেখেন, তাঁর সব শেষ হয়ে গেছে। ধারদেনা করে পাটের ব্যবসা করতেন তিনি। এখন সেই ব্যবসার পুঁজিও নেই। কীভাবে ঋণ শোধ করবেন, কিভাবে আবার ব্যবসা শুরু করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না পেলে পথে বসতে হবে বলে আশঙ্কা তাঁর।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মাসুদ মন্ডল বলেন, জমিজমা বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে পাট, পেঁয়াজ ও রসুন কিনে গুদামে রেখেছিলেন। তাঁর প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, পাটের গুদামে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ফলিয়া বাজারের অগ্নিকাণ্ডেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় একাধিক গুদাম ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশের বারাশিয়া নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর কাজ চালানো হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
বোয়ালমারী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার রয়েল আহমেদ বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।
আলফাডাঙ্গা ফায়ার স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ওবায়দুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। পাটের গুদামে আগুন লাগলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। পাশেই বারাশিয়া নদী থাকায় সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানো হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সোহেল রানা বলেন, খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী থেকে চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এতে প্রায় নয়টি গুদাম ও দোকানের পাট, পেঁয়াজ, চালসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে।
0 মন্তব্য