Main Menu

সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধের নির্দেশ

কাজী আরমান:: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যান চলাচল এবং ওভারটেকিংয়ের মতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘কেউ যদি অহেতুক নিয়মের বাইরে গিয়ে গাড়ি বা ট্রাকের আকার পরিবর্তন করে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের ট্রাফিক পুলিশকেও এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সড়ক নিরাপদ করতে গেলে সবার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার এ উপলক্ষে রাজধানীর খামারবাড়ীতে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সড়কে যানবাহন এবং পথচারীদের চলাচলের ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর থেকে এই দিনটি সারা দেশে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। শোভাযাত্রা, পোস্টার ও হ্যান্ডবিল বিতরণ, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শন এবং আলোচনা সভাসহ নানামুখী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ড্রাইভারদেরও দোষ আছে। কোনো গাড়ি ওভারটেক করলে তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ওই গাড়িকে তাদেরও ওভারটেক করতেই হবে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তিনি বলেন, একটি রাস্তা কেমন লোড নিতে পারে, একটি সড়কে কি ধরনের দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারে তার একটি আকার নির্দিষ্ট করা থাকে।

অথচ আমাদের দেশে দেখা যায়, অধিক মুনাফার আশায় আসন বৃদ্ধির জন্য বা অতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে এক্সট্রা ক্লাম দিয়ে দু’পাশে বেআইনিভাবে গাড়ির আকার বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতেও দুর্ঘটনা ঘটছে।’

অতীতে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তৈরি করা এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গৃহীত হলেও পরে তা থেমে যাওয়ার পর আবার তা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, ষড়ঋতুর এই দেশে ঋতু পরিবর্তন এবং নতুন ঋতু আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার মতো বৈশিষ্ট্য আমাদের মানসিকতায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। বিষয়টি সড়ক আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী বা আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিতে কেন আসেনি সে প্রশ্নও উত্থাপন করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের মানুষের একটা প্রবণতা হচ্ছে দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে সব থেকে বেশি গালমন্দ করা। তিনি চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয় স্বীকার করে নিয়ে বলেন, ‘দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কিন্তু কেবল চালক নয়, পথচারীরাও অনেকাংশে দায়ী।

কারণ ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, ওভারপাস থাকার পরও দেখা যায় যে, পথচারীরা রাস্তার মাঝখান দিয়ে পারাপার হচ্ছে, ফুটপাত ব্যবহার করছে না। একটি চলন্ত গাড়িকে হাত দেখিয়ে দৌড় দিয়ে বা মোবাইলে কথা বলতে বলতেই তারা রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গড়িটা তো একটা যন্ত্র। কাজেই ব্রেক করলেও থামতে কিছুটা সময় লাগে। কাজেই এই বোধটা বা জ্ঞান তো তাদের থাকতে হবে। সেই সঙ্গে সড়ক চলাচলের যে আইন আছে তাও মেনে চলতে হয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয় না।’

তিনি দেশের স্কুল পর্যায়ে ট্রাফিক আইন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

‘এজন্য স্কুল-কলেজ এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে অধিক জনবল কাজ করে তাদের মাঝে ট্রাফিক আইন বা ট্রাফিক রুল বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেয়াটা একান্তভাবে প্রয়োজন।’

গাড়িচালকদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চালকরাও মানুষ, তাদের বিশ্রাম ও আহারের প্রয়োজন আছে। সে বিষয়ে সবাই নজর দেন কিনা সন্দেহ, অনেকেই এ নিয়ে ভাবেন না। কাজেই একজন চালক দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালাতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই একটু ঝিমুনি আসতে পারে আর তখনই দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, ‘দূরপাল্লায় বিকল্প চালক না থাকলে অনেককেই অদক্ষ হেলপারের হাতে গাড়ি ছেড়ে দেয় এবং দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের জন্য সরকার উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ গ্রাম থেকে এসেই গাড়ি বা ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামতে পারবে না। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার এসডিজি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৭-২০২০’ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তার সরকার আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ কার্যকরের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানান। তিনি চালক এবং যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার এবং রিফ্রেসমেন্ট সেন্টার তৈরিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।

তার সরকার পেশাদার এক লাখ দক্ষ গাড়িচালক তৈরির জন্য কাজ করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, একই সঙ্গে ৩ লাখ দক্ষ গাড়িচালক তৈরির জন্য নতুন একটা প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ভেহিক্যাল ইন্সপেকশন সেন্টার এবং ড্রাইভার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি এ সময় স্কুল পর্যায়ে ট্রাফিক আইন প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন।

শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেন ট্রাফিক আইন মানবে না, প্রশ্নটি উত্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু কারও কাম্য নয়, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করুক সেটাও কাম্য হতে পারে না, কত মানুষের জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেজন্যই আমরা চাই সব সময় একটা নিরপদ সড়ক ব্যবস্থা থাকুক, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকুক।

দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।

কারণ দেশটা আমাদের, একটা মানুষের ক্ষতি হলে সে যেই হোক এ দেশের কোনো না কোনো পরিবারেরই তো সে। কাজেই, সেই পরিবারের ভবিষ্যৎটা কি হবে, সেটাও তো চিন্তা করতে হবে।’

নিরাপদ সড়কের জন্য তার সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আইনটিকে দ্রুত কার্যকর করারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা মহাসড়কগুলো চার লেনে রূপান্তর, বিপজ্জনক বাঁকগুলো মেরামতসহ বিভিন্ন সড়কের উন্নয়ন করছি। ফলে দুর্ঘটনা কমে এসেছে। জনগণ আরও সচেতন হলে তা একেবারেই কমে আসবে।






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*