Main Menu

রোহিঙ্গা সংকট কোন দিকে গড়াচ্ছে?

কাজী সাবরিনা:: বাংলাদেশে অবস্থানরত ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্ম-পরিচয় কিংবা নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান বর্তমানে একটি অবান্তর বিষয়। সোজাসাপটা কথা হল, তারা মিয়ানমারের অধিবাসী এবং বাংলাদেশে তাদের অবস্থান ক্ষণিকের। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।

রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এ দেশে নতুন নয়। ১৯৭৮ সালেও ২ লাখের মতো রোহিঙ্গা এসেছিল শরণার্থী হয়ে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ১৯৯০ সালেও কিছু অনুপ্রবেশ ঘটে এবং তার সমাধান করা হয়।

কিন্তু এবারের মতো এত বড় সমস্যায় বাংলাদেশ কখনও পড়েনি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট অর্থাৎ গত দুই বছরে শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখেরও বেশি। গত দুই বছরে কেবল আশ্রয় শিবিরগুলোতে জন্ম নেয় প্রায় ৬০ হাজার নবজাতক।

তার মানে হল আর যদি একজন শরণার্থীও বাংলাদেশে না আসে তারপরও ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ শতাংশ এবং খোদ মিয়ানমারে এ বৃদ্ধির হার এক শতাংশেরও কম (শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ)। তাই এ ভার আমাদের মতো দেশের পক্ষে বছরের পর বছর বহন করা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়ে গেছে। তাই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অত্যাবশ্যক।

এ অপরিহার্যতার কথা মাথায় নিয়ে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়; কিন্তু তা সফলতার মুখ দেখতে পারেনি। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই চীনের মধ্যস্থতায় গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কথা জানায় সরকার।

শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারে পাঠানো হলেও মিয়ানমার সরকার তাদের ভেতর থেকে মাত্র ৮ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনে নিতে রাজি হয়। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা হয় মাত্র ৩ হাজার ৫৪০ জনের। আমরা তখন হিসাব করেছিলাম, যদি জনসংখ্যা না বাড়ে (যদিও তা অসম্ভব) আর প্রতি মাসে যদি সরকার এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে পারে তারপরও আমাদের ২৫ বছর সময় লেগে যাবে।

তাই প্রত্যাবাসনের আকার-আয়তন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং তা যেন প্রতিদিনের কর্ম হয়। সেদিন বাংলাদেশের ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘাটে’ উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশন, মিয়ানমার ও চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা। অপরদিকে রাখাইন সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন রাখাইন রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা যা দাঁড়াল তার সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশার কোনো মিল নেই। ২২ আগস্ট দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৯৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, তারা কেউই মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি নয়। অপরদিকে বাংলাদেশও কাউকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়ার পক্ষপাতী নয়। ফলে প্রত্যাবাসনের সব প্রচেষ্টা বানের জলে ভেসে গেল।

রোহিঙ্গারা বেজায় খুশি হয়েছে বলে গণমাধ্যম মন্তব্য করেছে, পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের উদ্বিগ্ন হওয়ারই কথা। কেননা আমরা দূর থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি যত সহানুভূতিই দেখাই না কেন, প্রকৃত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে স্থানীয়রা। পারিপার্শ্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থানীয়দের সন্তানরা এক নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এ থেকে তাদের রেহাই দেয়াটা জরুরি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়দের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গারা ড্রাগ স্মাগলিং থেকে শুরু করে নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, যা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর মধ্যে রোহিঙ্গারা ২৫ আগস্ট লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ করেছে এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের ৫ দফা দাবি পূরণ না হলে তারা কোনোমতেই রাখাইনে ফিরে যাবে না।

দাবিগুলো হল- এক. রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থানীয় আদিবাসী এবং সেজন্য তাদের নেটিভ স্ট্যাটাস বা স্থানীয় মর্যাদা সংসদে আইন করে পুনর্বহাল করতে হবে, যার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি থাকতে হবে; দুই. প্রথমত, আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ‘সিটিজেন কার্ড’ দিতে হবে; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও সিটিজেন কার্ড দিয়ে প্রত্যাবাসন করে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে এবং তৃতীয়ত, একইসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় থাকা রোহিঙ্গাদের সিটিজেন কার্ড দিয়ে স্থানীয় নাগরিকের মর্যাদা দিতে হবে;

তিন. রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জমিজমা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে; চার. আরাকানে রোহিঙ্গাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে; পাঁচ. বার্মার স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো কোনো ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচার করতে হবে।

বুঝতেই পারছেন সমস্যা কোন দিকে গড়াচ্ছে। পাঁচটি দাবির কোনটিই বাংলাদেশের আয়ত্তে নেই, সম্পূর্ণ মিয়ানমারের হাতে। দুই নম্বর শর্তে তারা বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা রোহিঙ্গাদেরও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে, সেটার দায়ও আমাদের বহন করতে হবে! সুতরাং পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনেকেই বলে থাকেন, সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাই আজকের সমস্যার জন্য দায়ী। এ ধরনের কথা এক ধরনের দায়সারা গোছের এবং এভাবে সমস্যার গভীরে প্রবেশ করা যাবে না। কূটনৈতিক দিক দিয়ে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ একথা বলা যাবে না, কেননা তারা ইতিমধ্যে দু’দুবার প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করতে সক্ষম হয়েছে; সীমান্তের ওপারে রাখাইন প্রতিনিধিরাও রোহিঙ্গাদের গ্রহণে প্রস্তুত ছিলেন, যদিও ফলাফল অনুকূলে আসেনি। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশই বিনা স্বার্থে এগিয়ে আসে না। আমরা সবাই জানি, ভারত ও চীনের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা একাট্টা। অনেকেই মনে করেন, চীন ও ভারত আমাদের ভালো বন্ধু। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিতে আমি কার কতটা বন্ধু হব তা নির্ভর করে আমি তাকে কতটা বাজার সুবিধা দিতে পারব। সে বিবেচনায় আমরা ভারত ও চীনের বড় খদ্দের। ভালোবাসার ছিটেফোঁটা তো পেতেই পারি। তবে তা দিয়ে সমাধানের পথ পাওয়া যাবে কতখানি? মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষা করার দায় চীনের। চীনের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণে মিয়ানমারের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে কতটুকু আশা করতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক প্রফেসর ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বিবিসিকে বলেছেন, ‘মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বাইরে তৃতীয় দেশ হিসেবে শুধু চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাহায্য করতে পারে। তবে অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যুতে মিয়ানমার ও চীন একে অপরের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে সম্পর্কও বেশ ঘনিষ্ঠ। চীনের সমর্থন ছাড়া মিয়ানমার সরকারের মদদ পাওয়া বেশ কঠিন।’ তবে তারপরও আমরা চীনের সহযোগিতার খানিকটা প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি। এটাকে পুঁজি করে এগোতে হবে। চীনের পণ্যে আমাদের বাজার সয়লাব আর আমরা তাদের কোনো সাহায্য পাব না এটি যুক্তিসঙ্গত নয়। অনেকেই বলতে চেষ্টা করেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আবেগঘন এ কথার বিপরীতে আপনাকে ভাবতে হবে, ভারত আমাদের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আমদানি করে আর ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে। বাংলাদেশের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধার কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।

আরেকটি ভয়ংকর সংবাদ আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, সেটি হল এনজিওগুলোর নেতিবাচক ভূমিকা। সব এনজিওকে হয়তো ঢালাওভাবে দোষারোপ করা যাবে না, তাই বলে অভিযোগটিকে হালকাভাবে দেখা উচিত হবে না। শরণার্থী এলাকায় দেশি-বিদেশি ৬১টি এনজিও কাজ করছে। আমরা জানি, এত বড় একটা সমস্যাকে কেবল সরকারিভাবে মোকাবেলা করা যাবে না। কিন্তু রোহিঙ্গাদের উসকানি দেয়ার মতো কোনো কাজে যদি কোনো এনজিও জড়িত থাকে, তাহলে তাদের প্রতি কঠোর হতে হবে।

আমরা রোহিঙ্গাদের যে সহযোগিতা করছি তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নেই, স্রেফ মানবিক কারণেই তা করা হচ্ছে। আমরা রাখাইন রাজ্যও দখল করতে চাই না, আর মিয়ানমারের বাজারও করায়ত্ত করতে চাই না। আমরা চাই মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে তাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিয়ে যাক। আমাদের মানবিক দায়িত্বকে কেউ যদি দুর্বলতা মনে করে, তাহলে তা হবে সভ্যতার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি। আশা করি, বিশ্ব সভ্যতার বোধোদয় ঘটবে।
মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*