Main Menu

মূলধারার ইসলাম কী?

খোমেনী ইহসান:: আমার অনেক ফাইন্ডিংসের সেরা একটা হলো মূলধারার ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে বলার আগে একটা বিষয়ে নজর রাখছি। শীতকালে দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারের দিকে তাকালে দেখবেন বিভিন্ন ওয়াজ মহফিলের পোস্টারে লেখা থাকে ‌‘ঐতিহ্যবাহী’ তমুক মাদরাসার নাম।

মজার বিষয় হলো, মাদরাসাগুলো ৯০ ভাগই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত। হাতে গোনা কয়েকটি পাকিস্তান জমানায়। আর ব্রিটিশ জমানার মাদরাসা বড়ই বিরল, দু-একটা থাকলেও তাদের শেষ সময়ে হয়েছে।

বিষয়টা আমাকে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে বাংলাদেশে মূলধারার ইসলাম সম্পর্কে। এখানে ইসলামের বয়স হাজার থেকে বারোশ বছরের। কিন্তু মাদরাসাগুলো দুইশ বছরেরও বেশি বয়সী না। তাহলে এখানে যে মুসলিম সমাজ তা কোথা থেকে ধর্ম শিখল, যুগের পর যুগ ধরে এই সমাজ কীভাবে জারি থাকল?

আমি প্রচুর গান শুনি এবং গান দিয়ে সমাজ জানা আমার একটা অভ্যাস। সেই সূত্রে একটা বিষয় আমার মনে দাগ কাটছিল। নুসরাত ফতেহ আলী খানদের যে পরিবার, তারা কাওয়ালি গান গায় ছয়শ’ বছর ধরে।

এইটা আমাকে বড় নাড়া দিছিল যে একটা পরিবারের সুফি গান করার সিলসিলার বয়স যদি এত শত বছর হয়; তাহলে আমাদের দেশের ধর্মীয় ধারাগুলোর বয়স কেন সর্বোচ্চ দুইশ বছর হবে?

কাওয়ালি আমাকে আরেকটা ভাবনায় ফেলছিল যে খাজা নিজামুদ্দিনের (রহ.) গান শুনে দিল্লিতেই এক আসরে ৩৫ হাজার মানুষ মুসলমান হয়েছিল, পৃথিবীতে কোনো আলেমের ওয়াজ শুনে কি একসঙ্গে কখনো এতজন ইসলাম কবুল করেছিল?

এই প্রশ্নের সূত্রধরে একটা বিষয় খুঁজে পেলাম, আমরা এই সময়ে যে আলেম-উলামা দেখি, এরকম লোকদের হাতে বাংলাদেশে খুব বেশি মানুষ কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করেনি, চারিদিকে এত ওয়াজ-এত ধর্মীয় আলোচনা, কিন্তু খুব একটা লোকজন মুসলমান হয়নি।

কিন্তু দরবেশ ও পীরদের হাতে লাখ লাখ লোক মুসলমান হয়েছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, দরবেশ ও পীরদের এলেম-কালাম বর্তমান জমানার আল্লামা ও ডক্টরদের চেয়ে বেশিও ছিল না।

এখন যেই কথাটা বলতে চাই, বাংলাদেশে আমরা যে সব মাদরাসা, আলেম ও ধর্মীয় দল দেখি তার কোনো কিছুই দুইশ বছরের বেশি অতীতে যাইতে পারে না।

বিশেষ করে ধর্মীয় দলগুলোর বয়স একশও পার করেনি। অথচ মুসলিম সমাজের উপস্থিতি হাজার বছরের বেশি। আর এই সমাজ কোনো নির্জীব মৃত সমাজ ছিল না।

প্রায় আটশ বছরের শাসনের ইতিহাস আছে মুসলমানদের। তাদের সরকার-প্রশাসন-অর্থনীতিও ছিল। আর সেই সমাজই আসতে আসতে এই একুশ শতকেও জারি আছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ মুসলিম জনমণ্ডলো নিয়ে।

আমার দাবি হলো, এই সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে আরোপিত, এসব ছাড়াই মুসলিম সমাজ সচল সজীব ছিল এবং তা আছে।

মূলত ব্রিটিশ বিদায়ের পর বাঙালি মুসলিম সমাজে যে লিবারেল স্পেস তৈরি হয়েছে ও সম্পদ সঞ্চয়-সঞ্চালন ঘটেছে; তার হাত ধরেই নতুন ধারার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আলেম সম্প্রদায় ও ধর্মীয় দলগুলোর উত্থান ঘটেছে।

প্রচার মাধ্যম ও রাজনৈতিক পরিসরের কারসাজির মাধ্যমে এই ধর্মীয় সম্প্রদায় দিন দিন প্রভাব অর্জন করে মুসলিম জনমণ্ডলীর কর্তা বনে গেলেও হাজার বছরের পুরনো মুসলিম সমাজ এদের দ্বারা ফাংশন করে না।

এমনকি সমাজে যে ইসলাম মূলধারা হিসেবে ফাংশন করে তাও এদের নির্দেশিত ইসলাম নয়।

মোটাদাগে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর যে কওমী ধারা, সুন্নী ধারা, সালাফি ধারা রয়েছে; তা প্রচার মাধ্যমে খুব বেশি আওয়াজ করলেও সামগ্রিক মুসলিম সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এসবের কোনো কিছুই অনুসরণ করেন না।

বরং মূলধারার মুসলমানদের ইসলাম এদের থেকে ভিন্ন। সেটি অবশ্যই একটি মুসলিম সমাজ এবং ওই সমাজের মসজিদকে ঘিরে আবর্তিত। যেটাকে গ্রামপঞ্চায়েত বলে সেটা।

খেয়াল করলে দেখবেন প্রতিটা সমাজের ধারার শত শত বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে লোকজন মসজিদ ঘিরে সমবেত হয়, সেখানে তারা নামাজের একটা সরল ধারা অনুসরণ করে, নানা বিশেষ দিবস উদযাপন করে।

আর এই সমাজের নেতৃত্বটা থাকে মোড়লের হাতে। ঈমাম শুধু নামাজ পড়ান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আঞ্জাম দেন।

কিন্তু সমাজের বিয়েশাদি, জমিজমার ভাগ, দাফনকাফনসহ বৈষয়িক বিষয়াদি ডিল করে মুরব্বিরা। দেখবেন মুরব্বিদের এই ধারা খুঁজতে গেলে মোঘল পার হয়ে সুলতানি জমানাতেও যাইতে পারবেন। কিন্তু ঈমামের কোনো ইতিহাস নেই।

আমার বুঝ মতে মূলধারার ইসলাম কখনোই অমুক-তমুক তরিকা ও সিলসিলা নয়। বরং একটা ফাংশনাল মুসলিম সমাজই মূলত মূলধারার ইসলাম হিসেবে জারি আছে হাজার বছর ধরে।

এবং বিশিষ্টতা বিচার করলে এই ইসলাম যে মদিনার মুসলিম সমাজের মতোই ফাংশন করেছে তা দেখতে পাবেন।

মুশকিল হলো, আধুনিকতাবাদী ওরিয়েন্টালিস্ট(প্রাচ্যবিদ) জায়গা থেকে ইসলাম ও মুসলমানকে বুঝতে গিয়ে ধর্মশ্রেণীকে মুসলিম সমাজের মা-বাপ মনে করে বসায় আমরা প্রকৃত চিত্রটা আর দেখি না।






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*