Main Menu

কাজী আরমান

পিরিতির নাও ভেসে যায়

স্বপ্নবাজ:: বহুকাল পর জাহিদ হাসান মাহমুদের জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে সে চলে যায় সেই কবেকালের গ্রামের বাড়ি। বুকের ওপর ক্রস দিয়ে পরা হাফপ্যান্টের সাথে শার্ট। পায়ে বাটার কেডস। গ্রামের জলকাদা প্যাকের মধ্যে ছোট ছোট পায়ে ঘুরে বেড়ায় সে। খুব জ্বর যখন ওঠে, তখন ছাদ তার মুখের ওপর এসে ঝুকে পড়ে। সে তখন কোনো কিছু চিন্তা না করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। যতবারই সে ঘুমানোর চেষ্টা করে ততবারই ছাদ এসে তার চোখের ভেতর ঢুকে যায়। একসময় ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। পান্থপথের যে বাসায় সে থাকে, সে বাসার ছাদ তার চোখের ভেতর ঢুকে যেতে চায়। ঠিক তখন সে মুনিয়া আফসানাকে মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠায় যে, তার খুব ইচ্ছে করছে মুনিয়ার কণ্ঠস্বর শুনতে। কিন্তু মুনিয়া ফিরতি খুদেবার্তায় তাকে জানিয়ে দেয় যে, সে খুব ক্লান্ত থাকায় কথা বলার কোনো ইচ্ছেই নেই। সে তখন আরো হতাশ হয়ে পড়ে।

জন্মানো মানেই এখানে জীবন টেনে নেওয়া কোনোমতে। এখানে জীবনের কোনো মানে নেই। সব একই রকম। সাদা বা কালো। একবার সারা দিন তার বান্ধবী মুনিয়া আফসানার সঙ্গে আস্ত একটা দিন কাটিয়ে দেয় সে। এরপর ফিরে এসে তাকে দীর্ঘ এক চিঠি লিখেছিল জাহিদ। সেই বিরাট চিঠি পড়ে মুনিয়ার ভালো লাগার পরিবর্তে কুৎসিত অনুভূতি হয়েছিল। তবু মুনিয়াকে সে ঢাউস আকারের চিঠি লিখত। সে নিশ্চিত থাকত যে, এসব চিঠির অংশবিশেষও মুনিয়া পড়বে না। তবু সে পাঠাত। এই কারণে যে সে ছিল এই শহরের সব থেকে একা মানুষ। যার সাথে কথা বলার জন্য পাড়ার মোড়ের দোকানদারেরও কোনো আগ্রহ ছিল না। সময় পার করার জন্য সে মাঝে মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে লোকাল বাসগুলোতে উঠে পড়ত। বাস একের পর এক স্টেশন এলে কনডাক্টর তার দিকে বিরসমুখে তাকিয়ে বলত, ‘ভাই কই যাবেন?’ সে খুব লাজুক একটা হাসি দিয়ে এমন মুখভঙ্গি করত যার অর্থ হবে, গন্তব্য একদমই সন্নিকটে। তবে অধিকাংশ সময় সে না বুঝেই শ্যামলীতে নেমে পড়ত। আর নেমে পড়ার পর তার খেয়াল হতো এ এলাকায় মুনিয়া ২৮টি বসন্ত কাটিয়েছে। আর তখনই তার ভীষণ ক্লান্তি পেয়ে বসত। মুনিয়াকে এক নজর দেখার জন্য তার তখন নানা ধরনের ঘটনা তৈরি করতে হতো। সে ছিল সত্যিকার অর্থে নাছোড়বান্দা প্রেমিক। তবে মুনিয়ার এসব নিয়ে কোনো ভাবান্তর ছিল না। অন্যান্যদিনের মতো আজও শ্যামলীতে এসে বাস থেকে নেমে যায়। তখনই তার মনে পড়ে যায় আজ মুনিয়ার গায়ে হলুদ। তখন তার খুব ইচ্ছে করে মুনিয়াকে দেখতে। ইচ্ছেকে সে পাত্তা দেয় না।

বিড় বিড় করে আওড়াতে থাকে ‘আকাশেরও রয়েছে ইশারা! তবু আমরা ছুটে যাই বৃক্ষ ফেলে ইমারতের দিকে।’ আর তখনই একটি ৮ নম্বর বাস এসে তার শরীরের মাঝ বরাবর লাগিয়ে দেয়। ছিটকে পড়ে জাহিদ হাসান মাহমুদ। দূর থেকে দাঁড়িয়ে মফিজউদ্দিন দেখছিলেন ত্রিশের কাছাকাছি একজন যুবক বিড় বিড় করে আশ্চর্য এক মন্ত্র পড়ছেন। মন্ত্র না কবিতা সে ঠাওর করতে পারে না। তবে এভাবে বাসটি যুবককে চাপা দিয়ে চলে যাবে সে দৃশ্যের জন্য মফিজ অপেক্ষা করেনি। এই যুবকের সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে মিনার আশরাফের।

বাসচাপা যুবককে দেখে মফিজউদ্দিনের কিছুদিন আগের কথা মনে পড়ে যায়। সারা দেশে নাস্তিক ব্লগারদের কল্লা কাটা হচ্ছে। নাস্তিকরা বাঁচার আশায় পাড়ি দিচ্ছে আমেরিকা-ইউরোপে। বহু আলেম নাস্তিকদের কল্লা চায়। তারা আল্লাহ-রসুল নিয়ে রসালো গল্প করে। সেই গল্প ইন্টারনেট নাকি বোলগ এসব ছাপিয়ে তাদের হরিদাসপুরের বিল এলাকায় চলে যায়। এ রকম একসময় নাস্তিক কবি-বোলগার মিনার আশরাফ পালিয়ে এসেছিল হরিদাসপুরে।

হরিদাসপুরের একসময়ের জমিদারবাড়ি সৈয়দবাড়ির ভাগ্নে মিনার আশরাফের সঙ্গে তখনই পরিচয় হয় মফিজউদ্দিনের। সৈয়দ আমির-উল-জামিল সাহেবের একমাত্র বোনের ছেলে আশরাফ। ছেলেটি গ্রামে ছিল বেশ কিছুদিন। খুব একটা বাইরে যেত না। শুধু সন্ধ্যার পর তার সাথে দেখা হতো। মফিউজউদ্দিন আজান শেষ করে মসজিদের ভেতর প্রবেশের মুখেই দেখা হতো তার। সৈয়দবাড়ির বড় আত্মীয়। পুরোনো রেওয়াজ। মিনার আশরাফকে দেখলেই সে লম্বা সালাম দিত। তবে সেই সব অগুনতি সালামের উত্তর কখনোই আসেনি। শুধু কাঁধ ঝুঁকে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলত।

মফিজউদ্দিনের বিষয়টি প্রথমে ভালো না লাগলেও পরে একসময় এই রীতিটাই অনেক বেশি পছন্দ হয়েছিল। আশরাফকে সে কখনোই নামাজ পড়তে মসজিদে ঢুকতে দেখেনি। যদিও এসব ঘটনার কিছুদিন পরেই আশরাফের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আশরাফ খুব মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার কারণে মফিউজদ্দিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক দ্রুত উন্নতি লাভ করে। যদিও আশরাফ তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব বেশি খোলামেলা আলাপ করেনি, তবু মফিজউদ্দিন এই ধারণা পোষণ করে যে, আশরাফ আসলে কোনো কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বা ওই রকম গোছের কিছু হবে। তবে সে শুধু মফিজউদ্দিনের কাছে কেবল শুনতেই আগ্রহী ছিল।

আর মফিজউদ্দিন যেন গল্প বলার সেই জাদুকর। একের পর এক গল্প সে অবলীলায় বলে যেত। যে গল্প সে কোনোদিন কারোর কাছে করেনি। যে গল্প বলতে গিয়ে কখনো কখনো তার গলা ভারী হয়ে আসত। তার সুরমা দেওয়া চোখের নিচে পানি চিক চিক করত। ঠিক তখন আশরাফ বলে উঠত, চোখের জলের বিপরীতে যে ঘৃণা এটার একটা ক্ষমতা আছে। মানুষের উচিত সেই ক্ষমতা বা শক্তিকে শুধু মনের ভেতর অনুভব না করা। তাকে বুকের বাইরে নিয়ে আসা। এর পর থেকে আশরাফকে তার খুব কাছের মনে হতো। মফিজউদ্দিন তাকে অনেক গল্প শোনায়। সেই অদ্ভুত গল্পের মধ্যে তার নিজের গল্পও চালান করে দেয়। সে একনাগাড়ে তার গল্প বলে যায়। সেই গল্পের একেকটা চরিত্রের শুরু ও শেষ নেই। আশ্চর্য্য সেই সব বর্ণনায় মফিজউদ্দিন যেন ক্লান্ত হয় না। তবে আশরাফ সেই বর্ণনার মধ্যে প্রায়শই ডুব দেয় পদ্মবীলের গহিন পেটে। যে বিলের মধ্যে লাখ লাখ লালপদ্ম ফুটে আছে। লাল লাল ফুটে থাকা সেই ফুল বিলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে মফিজ নৌকা নিয়ে বসে পড়ে। তারপর মফিজের স্ত্রী মৌটুসী হিন্দু ধর্মের দেবী দুর্গার মতো লাল পাড়ের সাদা শাড়ি কপালের মাঝখানে টিপ যেন আরেকটি পদ্ম ফুল ফুটে ওঠে। মফিজ মৌটুসীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘোর ধরে যায়। সেই ঘোর লাগা সময় মফিজের যেন নিজেকে ইকতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি মনে হয়। এরপর নিচু হয়ে আসে মফিজের ঠোঁট। সেই ঠোঁট আর কোনোভাবেই ছাড়তে চায় না। যখন ভেতর থেকে মৃদু চিৎকার ভেসে ওঠে ডুবে যাওয়া মানুষের মতো ঠিক তখন শুধু আলতো করে মফিজ বলে, ‘বৌ লাগে।’ আর তখনই জায়গীর বাড়ির কাজের মেয়ে সালমা বুক থেকে ঠেলে সরিয়ে দেয় মফিজকে। তারপর ঘোৎ করে বলে, ‘সমিন্দি কি বাল কয়!’

এরপর আর শত চেষ্টায়ও মফিজ সালমার মান গলাতে পারে না। সারা রাত আর ঘুম আসে না মফিজের। তার ভেতরের আগুন শুকিয়ে অভিমান হয় মৌটুসীর ওপর। তখনই মনে পড়ে যায় পাশের গ্রামের রফিকের কথা। যে মৌটুসীকে দেখলেই কামুক দৃষ্টিতে বলে, ‘ভাবি কেমন আছেন’। এ সম্বোধনের কোনো উত্তর দেয় না মৌটুসী। শুধু নীরব সম্মতির হাসি দেয়। তাহলে মৌটুসীও কি সালমার মতো। যে সালমা তাকে পেট ডুকুর হুজুর বলে। সেই সালমা তাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে মুখে পর্যন্ত হাত দেয়। তারপর একদিন সন্ধ্যার বৃষ্টিতে মফিজের খুব জ্বরে আসে। সেই জ্বরে সে মসজিদে ঘুমোতে ভয় পায়। সেদিন সে কাচারি ঘরে বিছানা পাতে। মাথায় জলপট্টি দেওয়ার জন্য সৈয়দ আমির-উল-জামিলের জায়গীর হুজুরের জন্য বিধবা সালমাকে পাঠানো হয় মফিজের ঘরে। জল ঢালতে শুরু করে মাগরিবের আজানের পরে। সেই একদিনই আজান দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছিল আমির-উল-জামিল। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যদি দ্বিতীয়বার তাকে আজানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে মসজিদ কমিটির সভাপতি থেকে নিজেই নাম প্রত্যাহার করে নেবেন। তবে এরপর আর তাকে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। কারণ এরপর টানা এক বছর মফিজউদ্দিন মৌলানার আর জ্বর আসেনি। কিন্তু সেই জ্বরে পড়া রাতে মৌটুসী যখন আচমকা মফিজের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে, তখন তার গায়ের জ্বর কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। তার জ্বরকাতর ঠোঁটে মৌটুসীর ভরাট ঠোঁট নেয় নিজের মুখের ভেতর।

তারপর সে চলে যায় যেন কোথায়। সাদা সাদা মেঘের ভেতর। যখন বিদ্যুতের মতো কেপে ওঠে শান্ত হয়ে যায় ততক্ষণে মফিজের পিঠের নিচে সাদা চামড়ার ওপর সালমার নখের আঁচড়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত জমে যায়। তখনই টের পায় সালমার শিৎকার এখনো থামেনি। সে তখন নিজেই চড়ে বসে মফিজের বুকের ওপর। তারপর ভীষণভাবে কোমর মোড়াতে থাকে। একসময় তার শিৎকার থেমে যায়। ভয় পায় মফিজ। যদিও বৃষ্টির গর্জনে সালমার কণ্ঠের আওয়াজ ঘরের বাইরে যায় না। তবুও ভয় হয় মফিজের। যদি সালমার পেট ফুলে ওঠে। যদি সালমা তার সেই ফুলে ওঠা পেটের ভেতরে থাকা ভবিষ্যৎ শিশুর পিতা হিসেবে মফিজকেই দাবি করে বসে, তাহলে তার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। কারণ, মৌটুসী যে মফিজের জন্য কেমন ব্যাকুলভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকে জানালার দিকে, সে কী করে তার কাছে জবাব দেবে। এভাবে পুরো এক বছর ৩৭ দিন পার করার পরাও মফিজের মনের ভেতর মৌটুসী ভিন্ন অন্য নারী বিশেষ স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সে প্রতিবারই সালমার বুকের ওপর উত্তেজিত অবস্থায় মৌটুসী ভেবে বসে।

সতেরো শ টাকা মাইনে কি হয়? এই টাকায় মফিজ কী করে বৌয়ের জন্য শাড়ি, আলতা কেনে? প্রতিদিন খাতা দেখে তাকে খেতে যেতে হয়। খাওয়ার পর সে যখন বেরিয়ে আসে, তখন গ্রামের উঠতি ছেলেরা তাকে পেট ডুকুর হুজুর বলে, খিক করে হেসে ফেলে। তখন মফিজের খুব লজ্জা লাগে। মনে হয় পৃথিবীতে সব থেকে ওজনদার বস্তু হলো নিজের পেট। সাতদিন সাত বাড়িতে খাওয়ার প্রস্তাবটি সৈয়দ সাহেবেরই। তিনিই গ্রামের মুরব্বিদের ডেকে ঠিক করে দিয়েছেন কবে কার বাড়িতে খাবে মফিজ মৌলানা।

২.
সময় আন্দাজ করে মফিজ। এখন বারোটা বাজে। সব সময় ঘড়ির দিকে তাকানো লাগে না। আর সে কোনোদিন ঘড়ি পরেনি। কিন্তু সময়ের আন্দাজ কখনো ভুল হয়নি তার। সময় কত দৌড়ায়! তার খুব ইচ্ছে করে জানতে, আচ্ছা সময়ের পেছন বা সামনে বলে কি কিছু আছে? এর শুরু বা শেষ কোথায়? এসব নিয়ে সে একবার কথা বলেছিল মিনার আশরাফ। সেই যে ২৯ দিন গুনে গুনে সে পালিয়েছিল গ্রামে, তখন থেকে যেন লোকটা তার আপন হয়ে যায়। সে এই প্রশ্নগুলিই করেছিল আশরাফকে। আশরাফ আকাশ থেকে চোখ রাখে তার দিকে। তারপর আবার ডুবে যায় তার ফেলে আসা গল্পে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মফিজ মৌলানা। লাশ যাতে না কাটাছেঁড়া করা হয় তার জন্য দৌড়ঝাঁপ চলছে। বোঝা যাচ্ছে নিহতের চিন-পরিচয় অনেক মানুষের। ইতোমধ্যে দু-চারটি টিভি ক্যামেরা চলে এসেছে। মেয়েগুলান টিভির ডান্ডা সামনে এগিয়ে ধরেছে। যারা ক্যামেরার সামনে কথা বলছে, তাদের কথা এত দূর থেকে শোনা যাচ্ছে না। মফিজ সেসব কথার কিছু শুনতে পায় না। তার মধ্যে ঘুরেফিরে শুধু নিহতের শেষ বলা কয়েকটি লাইন মাথার মধ্যে পাক খাচ্ছে। দল থেকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে কোনো অবস্থায় যেন উটকো ঝামেলা না জড়ানোর জন্য। তবু কেন যে সে এই লাশের সাথে আঠার মতো লেগে আছে, ভাবতেই তার লজ্জা পায়। লজ্জার কথা মনে পড়লে তার আসলে মৌটুসীর কথা মনে পড়ে যায়।

মৌটুসি এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? সে কি এখন প্রতি চান্নি রাতে তার সৌদি ফেরত স্বামীর সাথে ধানক্ষেতের পাশে বসে থাকে। তারপর চাঁদ যখন একদম নেমে আসে ময়লা পীরের কবরের সিথানে ঠিক তখন সে কি তার স্বামীর পিঠে পিঠ দিয়ে বলে, ‘আমার না শহর দেখতে খুব ইচ্ছে করে।’

ঠিক আছে একদিন নিব তোমারে।

আমি কিন্তু সিনেমা দেখব। সিনেমায় কি সুন্দর শাড়ি পরে শাবনুর!

মফিজউদ্দিন বুঝতে পারে, কুসুমের চোখ বন্ধ হয়ে আছে। কুসুম শাড়ি পরে তার সামনে এলে সে সে বুঝতে পারে তার বউ শাবনুরের সামনে দাঁড়ালে শাবনুর লজ্জা পাবে। কিন্তু সে নিজেকে প্রবোধ দেয়।

‘কি কও বউ? সিনেমা বেশরিয়তি জিনিস। এসব দেখতে নাই।’ এরপর সে কুসুমকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। কিন্তু কুসুম যেন পাথর হয়ে যায়। এখন কি কুসুম আর তার সৌদি ফেরত স্বামীর সাথে শাবনুরের সিনেমা দেখতে শহরে যায়? তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। একবার সে গোপনে গিয়েছিল গ্রামে।

কেউ তাকে চিনতে পারেনি। পারবেই বা কী করে? এত বড় দাড়ি আর পাগড়ির নিচে মফিজের মায়াময় মুখটাই তো হারিয়ে গেছে। সৈয়দ বাড়ির সেই মসজিদে ছিল দুই রাত। কুসুমের স্বামীর বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করেও কিছু জানতে পারেনি।

মফিজের শুধু জানতে ইচ্ছে করে কুসুম ভালো আছে কি না। পুলিশের খাতায় মফিজ শীর্ষ জঙ্গি। ধরা পড়লে হাতিবান্ধা সিনেমা হলের বোমা বিস্ফোরণে নিশ্চিত ফাঁসি। সে ফাঁসির তোয়াক্কা করে না সে। এসব ফাঁসিকে এক পয়সা দিয়েও পোছে না মফিজ। সে জানে, সে নিশ্চিত দ্বীনের পথেই আছে। তবে মরে যাওয়ার পর যদি সে বেহেশতে যায়, তাহলে কি সে মৌটুসীকে পাবে? দলের এক বড় নেতাকে সে এ প্রশ্ন করেছিল। সেই নেতা খ্যাক করে উঠেছে। ‘যে নারী স্বামীকে ছেড়ে পরপুরুষের হাত ধরে চলে গেছে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে।’ এ কথা শোনার পরই মফিজের মন খারাপ হয়ে যায়। আহারে! মৌটুসীর শরীর আগুনে পুড়বে, ওমন মায়ার শরীর আগুনে পুড়ে যাবে-ভাবতেই চোখ দিয়ে জল পড়ে মফিজের। বুঝতে পেরে ওই নেতা গভীর রাতে মফিজকে ডেকে নেয় নিজের রুমে। কাছে বসিয়ে রাখে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বলে, ‘মফিজ পৃথিবীতে সব থেকে বড় শত্রু কে জানো?’ নেতার কথায় সে কোনো উত্তর দেয় না। নেতা আবার নিজেই উত্তর দেয়। ‘মায়া। মায়া হলো বড় ইবলিশ।’

পুনশ্চঃ এরপর মফিজের সাথে আমার দেখা হয়নি। শুনেছি সে আরো ভাটির অঞ্চলে কোথায় যেন গেছে। কিন্তু তার সাথে আর দেখা হয়নি। আশা করছি আবার দেখা হবে। এবার দেখা হলে বাকি গল্পটুকু শুনব। মফিজের কাছে বাকি গল্পটুকু জানতে পারলে এটা নিশ্চিত করছি সেটি আপনাদের জানাব।

পিরিতির নাও ভেসে যায়
কাজী আরমান






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*