Main Menu

নানা কৌশলে রোহিঙ্গারা ভোটার: একই এলাকার ভোটার ফরম ১৪ থানায়

শারমিন শিলা:: নানা কৌশলে ভোটার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। এক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে একই এলাকার একটি ভোটার বইয়ের ৭৪টি নিবন্ধন ফরমের মাধ্যমে অন্তত ৬ জেলার ১৪টি থানা নির্বাচন অফিস থেকে তাদের ভোটার করা হয়েছে। আর এ ঘটনা যাতে ফাঁস না হয়, সেজন্য কৌশল হিসেবে ওই বইয়ের ফরমে ভোটার করা হয়েছে রোহিঙ্গার পাশাপাশি কয়েকজন প্রকৃত নাগরিককেও। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন- এমন ৪৬ জন রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সার্ভারে ব্লক করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা ঠেকাতে ৫১৮টি থানা ও উপজেলা অফিসের সার্ভারের পাসওয়ার্ড ও কোড নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব পরিবর্তনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি নতুন করে আরও রোহিঙ্গাদের নাম ঢুকতে পারে- এমন আশঙ্কায় ৩ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার্ভারে নতুন ভোটারদের তথ্য আপলোড করার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে সতর্কতা জারি করে সব আঞ্চলিক, জেলা ও থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের চিঠি দিতে যাচ্ছে কমিশন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের নির্বিঘ্নে ভোটার করার পেছনে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী চক্র সার্বক্ষণিক কাজ করছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই চক্রকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সার্বিক সহযোগিতা করছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি। ওই চক্রের চার সদস্যকে নজরদারিতে রেখেছে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে গত দু’দিন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গোপন অভিযানও চালানো হয়েছে। যে কোনো সময় বেশ কয়েকজন আটক হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ সূত্র। একই প্রক্রিয়ায় আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একই বইয়ের ফরমে কয়েকটি থানায় ভোটার হওয়ার বিষয়টি জেনেই তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এছাড়া ৪৬ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক করে রেখেছি। সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুষ্ট চক্র ধরতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির দু’জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে যুগান্তরকে বলেন, টাকার বিনিময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় একটি চক্র রোহিঙ্গাদের ভোটার করছে। এ কাজে ইসির ভেতর ও বাইরে থাকা চক্র কাজ করছে। রোহিঙ্গাদের আত্মীয় পরিচয়ে স্থানীয়রা শনাক্ত করছে। জমা দিচ্ছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ওই দুই কর্মকর্তা আরও জানান, বিভিন্ন সময়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদে কাজ করা তথ্য সংগ্রহকারী, সুপারভাইজার বা ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা। এছাড়া চট্টগ্রামের ৩২টি উপজেলা বিশেষ এলাকা ঘোষণা করায় অন্যান্য জেলা থেকে রোহিঙ্গারা ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের হাতে পাসপোর্টও চলে যাচ্ছে। অথচ পাসপোর্ট করার আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যোগসাজশ ছাড়া রোহিঙ্গারা ভোটার হতে পারে না। যেসব রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে ভোটার হয়েছেন, তাদের পেছনে চক্র রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভোটার নিবন্ধন ফরম (ফরম-২) কিভাবে বাইরে গেল, কিভাবে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন নাগরিক ভোটার হন। ওই প্রক্রিয়া ভেদ করে কিভাবে রোহিঙ্গা ভোটার হল, এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে দেখা দরকার। রোহিঙ্গারা ভোটার হওয়ার অর্থই হচ্ছে- যারা ভোটার প্রক্রিয়ায় সুপারভাইজ করেন, তারা সঠিকভাবে কাজ করেননি, যারা রেজিস্ট্রেশন করেছে তারা সবকিছু খতিয়ে দেখেননি। এখন থেকেই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। এতে দেশের নিরাপত্তা ও ইমেজ (ভাবমূর্তি) ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন এই সাবেক কমিশনার।

সংশিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত দুই দিনে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় কয়েক দফায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা রোহিঙ্গা ভোটারদের চিহ্নিত করে তাদের সহযোগীদের আটকের চেষ্টা চালাচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের ভোটার করার চক্রের অন্তত চার সদস্যকে কৌশলগত কারণে দুই দিন ধরে নিবিড় নজরদারিতে রেখেছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের দু’জন ও কক্সবাজারের দু’জন রয়েছেন। ওই চক্রের সঙ্গে কাদের যোগসাজশ রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যে এই চক্রের কয়েক সদস্যকে আটকের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অভিযানের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

আরও জানা গেছে, রোহিঙ্গা নারী লাকী আটকের পর এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসে ইসি। চট্টগ্রামের একটি থানা নির্বাচন অফিসের তদন্তে এক এলাকার ফরমে অন্তত ১৪টি থানায় ভোটার হওয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ওই ঘটনায় ইসির একজন উপসচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। ওই কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যেককে ভোটার হতে হলে ‘নিবন্ধন ফরম-২’ পূরণ করতে হয়। প্রতিটি ফরমের ভিন্ন নম্বর থাকে। একই নম্বরে একাধিক ব্যক্তি ভোটার হতে পারেন না। প্রতিটি ফরমের বইতে একশ’টি ফরম থাকে। সাধারণত পুরো বই একটি থানা নির্বাচন অফিসে পাঠানো হয়। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ৪১৮৬৬৩০১ থেকে ৪১৮৬৬৪০০ নম্বরের ফরমগুলোর মধ্যে ৭৪টি ফরম অন্তত ১৪টি থানার ঠিকানায় পূরণ করে ওই থানার পাসওয়ার্ড ও কোর্ড নম্বর ব্যবহার করে ভোটার সার্ভারে আপলোড করা হয়েছে। অথচ একটি থানায় এসব ফরম ব্যবহারের কথা ছিল।

যেসব থানায় এসব ফরম ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রামের কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া। নোয়াখালীর সেনবাগ, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ, রাঙ্গামাটির লংঘদু, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি এবং লক্ষ্মীপুরের কমলনগর।

ইতিমধ্যে ৪৬টি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক করা হয়েছে। এগুলো রোহিঙ্গা ভোটার। ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে সার্ভারে তাদের অসম্পূর্ণ ফরম আপলোড করা হয়েছে। ফিঙ্গার প্রিন্ট ছিল না। এ কাজে ইসির আইটি শাখার দু-একজন কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারে অথবা তাদের পাসওয়ার্ড দিয়ে অন্য কেউ এ কাজ করতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

এদিকে ইসি সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন জেলায় ভোটার হওয়ার ঘটনায় ইসি উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় সব থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সতর্ক করে চিঠি দেয়া হচ্ছে। ওই চিঠিতে নতুন ভোটার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ এলাকা ঘোষিত ৩২টি থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের আরেকটি চিঠি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া ঠেকাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক সংগ্রহ করেছে কমিশন। নতুন ভোটার করার আগে রোহিঙ্গাদের সার্ভারে চেক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*