Main Menu

ইতালির ভেনিস অপরূপ সুন্দর

নুসরাত জাহান রিম:: ইতালির অন্যতম পর্যটন নগরী ভেনিস পর্যটকদের মুখে ভেনিস হলো স্বপ্নের এক অপরূপ শহর। ভাসমান এ শহরটি দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসে। ফলে ইতালি সরকারের অন্যতম আরেকটি আয়ের উৎস ভেনিস।

উত্তর-পূর্ব ভেনেতো এলাকায় অবস্থিত ভেনিস। এটি একসময় ছিল প্রজাতন্ত্রের রাজধানী এবং

“প্রশান্ত” অথবা শাসক” হিসাবে পরিচিত ছিল জলকন্যা খ্যাত ভেনিস। এর উচ্চতা ২মিটার ৭ ফুট, স্থলভাগের চেয়ে জলভাগের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই ভেনিসের সৌন্দর্য শুধুমাত্র জলপথে। ভেনিসের জনসংখ্যা ৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৪। দেশটি ভ্রমণ করতে প্রতি বছর ২০ মিলিয়ন পর্যটন আসে।

দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস হলেও সময়, ব্যস্ততার কারনে ইতালির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান তার মধ্যে অন্যতম শহর ভেনিস দেখা হয়নি। প্রতি বছর মাতৃভূমিতে আত্মীয় আর পরিজনের ভালবাসার টানে দেশে যাই। এ বছর দেশে যাওয়া হয়নি। সাধারণ অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ সবই আগস্ট মাসে বন্ধ থাকে। আমার কর্মস্থল তার ব্যতিক্রম নয়। দু’সপ্তাহের ছুটি ভাবতে ভাবতে এক সপ্তাহ চলে যায়।

তাই এবার মনোবল শক্ত করে সিদ্ধান্ত ভেনিসে যাওয়ার। রোমের দ্বিতীয় দূরপাল্লার ট্রেন স্টেশন তিবুরতিনা থেকে প্রথমে শুধু মাত্র ওয়ানওয়ে রোম টু ভেনিস টিকেট নিলাম। দুটি টিকেটের মূল্য ১২৯ ইউরো বাংলা টাকায় প্রায় ১২ হাজার টাকা। যাইহোক, ফেরত টিকেট ক্রয় করিনি। টিকেট বিক্রেতা বলল ফেরত টিকেট নিয়ে নাও। পরে কিন্তু দাম বেড়ে যাবে আগস্ট বলে কথা। আমি তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওনা শুরু করি।

সিড়ি দিয়ে নিচে নামার পর ভাবলাম যদি টিকেটের দাম বেড়েই যায়। আবারও ছুটে গিয়ে ফেরত টিকেট নিলাম আশি ইউরো দিয়ে। বাংলা টাকায় প্রায় সাত হাজার দুইশ টাকা। যা পড়ে কিনলে একশ ইউরো বেশি দাম পড়ত। যাওয়ার দুইদিন আগে আমার বন্ধুবর ভাই নিজাম তার পরিবার নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেন। তারা অবশ্য দুদিন পরে চলে আসবে।

তিন দিনের ছুটি কাটাতে সকাল ৮ টা পঁচিশের ট্রেন ধরি ভেনিসের উদ্দেশ্য দুটি পরিবার। হাসি আর আনন্দের কোন কমতি নেই। দ্রুত গতির ট্রেন ঘন্টায় প্রায় ২৪৯ কিমি চলে। সাড়ে তিন ঘন্টার মধ্যে ভেনিসের মেসত্রে এসে পৌঁছেছি। দুজনার হোটেল বুকিং দেয়া ছিল। পরবর্তী একই হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে আমার হোটেলের বুকিং বাদ দিয়ে দেই এতে করে আমার পঞ্চাশ ইউরো জরিমানা দিতে হয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষকে। হোটেল উঠলাম মনে ভীষণ আনন্দ।

প্রথম দিনেই উল্লেখযোগ্য স্থান সান মারকো ঘুরলাম। অত্যান্ত সুন্দর একটি পরিপাটি এলাকা চোখ যেখানেই যায় যেন নয়নের সঙ্গে মন জুড়ায়। এই সানমারকোতে বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা কবুতরকে খাবার দিল হাতে এসে বসে। আর এই সুন্দর দৃশ্য সবাই ক্যামেরায় ধারণ করে রাখে।

সত্যিকারার্থে ভেনিসের প্রতিটি দ্বীপ চোখ দিয়ে উপভোগ করার মত। কোন মানুষ যদি স্রষ্টার সৃষ্টি গভীর ভাবে চিন্তা করে অবশ্যই তার সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হবে। চারিদিকে থৈথৈ পানির মাঝে বসবাস, স্কুল, কলেজসহ সব ধরনের অফিস।

পরের দিন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই আমার শ্রদ্ধাভাজন শাহাদাত হোসেনের বাসায় গেলাম। অত্যান্ত মনোমুগ্ধকর আপ্যায়নে প্রবাসে পেলাম এক টুকরো বাংলাদেশের মাঝে সুন্দর একটি পরিবার। হাস্যোজ্জল আলাপচারিতায় ভুলেই গিয়েছিলাম আমরা ইতালিতে অবস্থান করছি। শাহাদাত ভাই ও ফারজানা ইয়াসমিন লতা ভাবীর কাছে কৃতজ্ঞ ব্যস্ততার মাঝে দেশের মত আপ্যায়নে মুগ্ধতায় যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে প্রবাস জীবনে।

একটি কথা না বললেই নয় দেশের জাতীয় মাছ চাঁদপুরের সেই পদ্মার ইলিশের যে পরিবেশন তা দেখে যে কারো মুখে লালা চলে আসবে খাওয়ার জন্য। শাহাদাত, লতা পরিবারকে আবারও ধন্যবাদ।

এর আগে প্রবীন লেখক ও সাংবাদিক ভেনিসের অত্যান্ত সুপরিচিতজন পলাশ রহমান তার সঙ্গে কথা হলে ব্যস্ততা ডিঙিয়ে তিনি দেখা করেন এবং এক সঙ্গে মিষ্টি মুখ করি ভেনিসের মেসত্রে নুর আলি পাঠান স্বত্বাধিকারী আল মদিনা বাংলা মিষ্টি ঘর। অল্প সময়ে বেশ আনন্দ পেলাম। ফোনে কথা হয় দেখা হয় এক যুগ পর। কৃতজ্ঞ পলাশ ভাই আপনার মূল্যবান সময় আমায় দেয়ার জন্য। এরপর কিছুটা সময় দেই ভেনিস বাংলা প্রেসক্লাবকে তাদের সঙ্গে সুন্দর আরেকটি সময় কাটে যদিও তা ছিল প্রেসক্লাব বিষয়ক মতবিনিময়। এভাবেই তিনটি দিন আনন্দ, উল্লাসে কাটে। তারপর ফের রোমে চলে আসা। নতুনভাবে নিজ কর্মস্থলে যোগদান করে ছুটি পরবর্তী যান্ত্রিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করি।

ভেনিসের জলপথ হচ্ছে একমাত্র যাতায়াতের পথ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থল পথে মানুষ চলাচল করে আর ভেনিস উল্টোদিকে। সানমারকো, মুরানো, বুরানো ও লিদো সমুদ্রসহ প্রতিটি দ্বীপে বসবাসকারীদের জল পথই ভরসা। এমনকি অসুস্থ রোগীর জন্য জরুরি অ্যাম্বুলেন্স দরকার হলে সেটিও জলপথ দিয়ে যেতে হয়। স্পিড বোর্ড হচ্ছে তাদের অ্যাম্বুলেন্স। যা সত্যি মানুষকে আশ্চর্য করে। এক একটি দ্বীপের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য তাই পর্যটকরা ভীষন আনন্দ পান ঘুরতে এসে। বুরানো’র একটি দৃশ্য আমাকে চমক দেয়। কোনো রোগীকে হাসপাতালে যেতে হলে স্পীড বোডকে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে জরুরিভাবে ব্যবহার করা হয়।

যেমন মুরানো কাচের তৈরি আশ্চর্য জিনিস তৈরি করে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মহিলাদের কানের দুল থেকে শুরু করে সবই তৈরি হয় কাঁচ দিয়ে। আর বুরানো এলাকায় রংবেরঙের বাসাবাড়ি ছোট ছোট আবাসস্থল এক একটি বাসা এক এক রং দিয়ে মোড়ানো যা খুব সহজে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে।

পর্যটন নগরী হিসেবে বাংলাদেশিরা ভেনিসের বিভিন্ন শহরে গড়ে তুলেছেন নানান রকম ব্যবসা। পর্যটকদের অধিক আনাগোনা রয়েছে বলে হোটেল, সুবিনর ব্যবসা বেশ জমিয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। বিশেষ করে হোটেল ব্যবসায় তাদের আধিপত্য বিস্তার দেখা গেছে।

ভেনিসের বুরানো নামক দ্বীপে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা। তিনি কথায় কথায় বললেন, দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে ইতালিতে অবস্থান করছি। পরিবার নিয়ে লিদো নামক স্থানে বসবাস করি। ব্যবসা করি বুরানো দ্বীপে। এই এলাকায় প্রতিদিন পর্যটকদের ভিড় থাকে। ব্যবসা করতে কোন সমস্যা হয়না। কেউ কোন ঝামেলা করেনা। বিশেষ করে জীবনের নিরাপত্তা অনেক বেশি। আমাদের দেশের মত কোন চাঁদাবাজি নেই। যে যার যার মত করে সারাদিন ব্যবসা করে বিকেলে স্বচ্ছন্দে বাসায় ফিরে। তার কথা শুনে ভাল লাগল তিনি জানালেন যদি কোন অকাল মৃত্যু না হয়। তাহলে কেউ কাউকে মারতে আসেনা। দেশের চেয়ে সুন্দর, পরিপাটি চলা যায়। হাসপাতাল, স্কুল ও কলেজে সব নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

ভেনিসের স্থলভাগের পরিমাণ ৬০.৫৬ এর জলভাগ ৯৯.৫১ বর্গমাইল। যার ফলে ভেনিসের অপরূপ সৌন্দর্য্য ভ্রমণ পিয়াসীদের দেখতে জলপথের বিকল্প নেই। বসবাসের দিক থেকে এর জনঘনত্ব ১৬৯৩.১ বর্গমাইল।

ডেটামের চেয়ে ৮০ সেন্টিমিটারেরও বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠ। যাকে”উচ্চ জল” বলা হয়: ফলে এই স্তরে পরিবহন ও পথচারীদের ব্যবহার জড়িত অনেক সমস্যা দেখা দেয়।

কোন কোন সময় সৌন্দর্যের মাঝে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। জোয়ার যখন একশ সেমি. ছাড়িয়ে যায়। জনসাধারণের ৫ ভাগ জমি

প্লাবিত হয়। তখন পথচারী অঞ্চলগুলির বৃহৎ অংশগুলিকে প্রভাবিত করা শুরু করে।

প্লাস একশ দশ সেমি উচ্চতায়, শহরের প্রায় ১২ ভাগ বন্যায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু যখন স্তরটি প্লাস একশ চল্লিশ সেমি পৌঁছে তখন শহরে প্রায় ৫৯ ভাগ বন্যা বয়ে যায়।

লেখক,ইতালি প্রবাসী সংবাদকর্মী






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*